সবুজ প্রবৃদ্ধির ধারণার ধারাবাহিকতায় ইউরোপসহ উন্নত বিশ্ব এখন জোর দিচ্ছে চক্রাকার অর্থনীতিতে। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চক্রাকার অর্থনীতির জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে। বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী নেদারল্যান্ডস পরিবর্তিত উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চক্রাকার অর্থনীতির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে।
নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলেম আলেক্সান্ডার দেশটিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে গত বৃহস্পতিবার এই আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত এদিন নেদারল্যান্ডসের রাজার দপ্তরে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করেন।
ইইউর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জোটটি ২০১৫ সালে একটি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে কাজ করছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, চক্রাকার অর্থনীতিতে লোকজনকে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত মানের নিরাপদ পণ্য দেওয়া হবে। যা অতীতের পণ্যের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই ও পুনঃউৎপাদনযোগ্য হবে। উন্নততর জীবন, সৃজনশীল কর্মসংস্থান, উন্নততর জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিতের স্বার্থে পরিকল্পনায় টেকসই সেবার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য হচ্ছে, চক্রাকার অর্থনীতির কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় কার্বননিঃসরণ কমানো। এ ছাড়া কমপক্ষে ৬০ হাজার বিলিয়ন ইউরোর খরচ কমানোর পাশাপাশি অন্তত ৫ লাখ ৮০ হাজার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো শুরুতে নিজেরা চক্রাকার অর্থনীতির কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে এই জোটের ২৭ দেশে পণ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে একই ধারায় পণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।
চক্রাকার অর্থনীতিতে পণ্যের পুনঃউৎপাদন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একটি পণ্যের এক-চতুর্থাংশ যাতে পুনঃউৎপাদন করা যায়, তাতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তাই এখন আর পণ্য উৎপাদনে পানি, বিদ্যুতের উৎসই নয়, পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে পুনঃউৎপাদন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রতিবেশী ভারত ইউরোপের বাজারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে নিজেদের তৈরি করে ফেলেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাজারের ৬০ শতাংশ হচ্ছে ইউরোপ। তাই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের মানিয়ে নিতে দ্রুত তৈরি হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ গতকাল বলেন, নেদারল্যান্ডসের রাজার কাছে পরিচয়পত্র দেওয়ার সময় সহযোগিতার বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। এ সময় চক্রাকার অর্থনীতি তথা টেকসই উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের দেশগুলো ইতিমধ্যে এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এই ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সে ব্যাপারে তিনি আগ্রহ দেখিয়েছেন।
নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলেম আলেক্সান্ডার ও বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত
নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলেম আলেক্সান্ডার ও বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত
এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ জানান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে বাংলাদেশ সামাজিকসহ নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে চলছে। তাই উৎপাদন ব্যবস্থায় সীমিত না থেকে সৃজনশীল ক্ষেত্রগুলোতে যাতে নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে, সে জন্য রাষ্ট্রদূত দেশটির রাজাকে অনুরোধ করেছেন।
নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
করোনা পাল্টে দিয়েছে সব
করোনার সংক্রমণ পাল্টে দিয়েছে সারা দুনিয়াকে। এর ব্যতিক্রম নয় নেদারল্যান্ডস। বিশেষ করে লেনদেন-কেনাকাটা সব কিছুই এখন দেশটিতে চলছে স্পর্শহীন। সব মিলিয়ে দেশটির আগের অবস্থায় ফিরে যেতে তিন থেকে চার মাস লাগবে। ওই সময় বোঝা যাবে, ক্রেতার চাহিদা আর মানসিকতা কতটা বদলেছে। কারণ এই মুহূর্তে দেশটিতে নগদ কোনো লেনদেন প্রায় হচ্ছে না বললেই চলে। তাই করোনা-পরবর্তী সময়ে লেনদেন এখানকার মতো স্পর্শহীন থাকবে, নাকি আগের অবস্থায় ফিরবে, তা বলা মুশকিল।
গতকাল নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশ দূতাবাসে এক সামাজিক সম্মিলনের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সম্মানে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে আলোচনার একপর্যায়ে ইউরোপের অর্থনীতি পাল্টে যাওয়ার প্রসঙ্গটি নিয়ে বেশ কয়েকজন আলোচনা করেন। অতিথিদের কেউ কেউ তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চেয়েছেন, বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাংলাদেশ কতটা তৈরি হয়েছে।
তিন দশক আগের সফরের স্মৃতি
নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলেম প্রায় তিন দশক আগে জাতিসংঘের পানি ও পয়ঃনিস্কাশন বিষয়ক পরামর্শক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। গতকাল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পরিচয়পত্র পেশ করতে গেলে রাজা উইলেম তাঁর ওই সফরের স্মৃতিচারণা করেন। নতুন রাষ্ট্রদূতের কাছে তিনি বাংলাদেশের নগরায়ন, জীবন ও সুপেয় পানি সরবরাহের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন।
নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজা উইলেম বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। উভয় বদ্বীপ দেশ তাদের মধ্যকার সাধারণ ইস্যুসহ জলবায়ু পরিবর্তন, নারী, টেকসই উৎপাদন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অধিকতর সহযোগিতামূলক অবস্থান গ্রহণ করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ডাচ সরকারের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। করোনা দুর্যোগকালীন ডাচ সরকারের উদ্যেগে ও ডাচ তৈরি পোশাক ব্র্যান্ডদের অব্যাহত সরবরাহ-সাহায্যের জন্যও তিনি বাংলাদেশের পক্ষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ডাচ উদ্যোক্তাদের কৃষি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, পানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদ্যমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগ সুবিধার বিষয়গুলো তিনি রাজার কাছে তুলে ধরেন।