দেশ থেকে অর্থ পাচার করে কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের নানা দেশে যারা গাড়ি-বাড়ি করেছেন তাদের তালিকা দাখিল না করায় উষ্মা প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, আমরা তো পত্রিকায় দেখি বেগম পাড়া, সাহেব পাড়াসহ আরও কতো পাড়ার নাম। এসব পাড়ায় কারা থাকেন, তাদের নামটা জানা দরকার। বিচারটা দূরে থাক, নামটাও কি জানা যাবে না! অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলার তথ্য উপস্থাপনকালে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার দুদক কৌসুলির উদ্দেশ্যে এসব মন্তব্য করেন।
হাইকোর্ট বলেন, পত্রিকায় এসেছে রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার, সরকারি কর্মকর্তা, আমলাসহ অনেকেই বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, এদের নাম জানতে চাই। আদালত বলেন, সময় দরকার হলে নিন, কিন্তু অর্থ পাচারকারীদের বিদেশে কোথায় কি আছে সে সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য কোর্টকে জানাতে হবে। এরপরই হাইকোর্ট ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় মঞ্জুর করে অর্থ পাচারকারীদের নামের তালিকা দাখিল করতে দুদকসহ সরকারি সবগুলো সংস্থাকে নির্দেশ দেয়।
শুনানির আগে দুদক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইউ), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের আইজি, এনবিআরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে আদালতে লিখিত প্রতিবেদন দাখিল করেন। দুদকের দাখিলকৃত প্রতিবেদনে ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মানি লন্ড্রারিং আইনের ধারা যুক্ত করে ৪৪ মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে তার তালিকা তুলে ধরা হয়। যেখানে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূইয়ার নাম রয়েছে। এছাড়া মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) সংক্রান্ত মামলার তালিকাও দিয়েছে দুদক। যেখানে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালু, সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদের নাম রয়েছে।
এসব নাম তুলে ধরে দুদকের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আদালতকে জানান কৌসুলি খুরশীদ আলম খান। তখন হাইকোর্ট বলেন, গত ২২ নভেম্বর যে আদেশ দিয়েছি তার প্রেক্ষিতে নতুন কি তথ্য পেয়েছেন তা জানান। পুরাতন কাহিনী শুনিয়ে লাভ নাই। এগুলো তো সবাই জানে। যেসব তথ্য দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট হতে পারছি না। ২০১৬ সাল থেকে মামলা করেছে সেটা ঠিক আছে, এটা তো করবেনই। কিন্তু যারা দেশ থেকে টাকা পাচার করে বিদেশে গাড়ি-বাড়ি করেছে তাদের সর্বশেষ নাম ঠিকানা দিন। অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে সরকারের যেসব সংস্থা রয়েছে তারা যদি কাজ করে তাদের নাম জানাটা কি অসম্ভব।
হাইকোর্ট বলে, আমরা দেশ ও দেশের মানুষকে সহযোগিতা করতে চাই। যেসব নিউজ অর্থ পাচার নিয়ে দেখেছি সেগুলো তো উদ্বেগজনক। আমরা যদি পদে থেকে দায়িত্ব পালন না করি তাহলে যখন পদে থাকব না তখন মানুষ আমাদের প্রশ্ন করবে, বলবে আপনারা তো বিচারক ছিলেন, কি করেছেন। সবসময় তো আর দায়িত্বে থাকব না, তখন মানুষ জিজ্ঞাসা করবে কিছুই তো করেননি, তখন তো আমরা লজ্জায় পড়ব। এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, আমি সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে কোর্টকে সহায়তা করার চেষ্টা করব।
আদালত বলেন, দেশে ১৮ কোটি মানুষ। এর মধ্যে স্বল্প সংখ্যক মানুষ অর্থ পাচার ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আর যারা অপরাধ করে তারা ভীত মানুষ, সাহসী নয়। কিন্তু আমরা তাদের ধরতে পারছি না। আপনারা তাদের ধরতে পদক্ষেপ নিন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অবশ্যই তাদের নাম জানতে পারবেন। আদালত বলেন, নাম দিলে অসুবিধা কোথায়। দুদক কৌসুলি বলেন, সম্রাট, সাঈদ সেলিম প্রধান যারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে এরা গাড়ি-বাড়ি করেছে। আদালত বলেন, নাম জানা গেলে ব্যবস্থা নেওয়াটা সহজ হবে।
এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে কোর্টকে অবহিত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, কানাডায় বাংলাদেশ দূতাবাসে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অন্য দেশের দূতাবাসে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এসময় রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিনউদ্দিন মানিক ও তাহমিনা পলি শুনানি করেন।