বাংলাদেশ-ভারত আরেকটি ফুটবল ম্যাচ কড়া নাড়ছে দরজায়। পরশু ৭ জুন দোহায় দুই দল মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে। এই ম্যাচের আগে স্মৃতিতে উঁকি দিচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত অনেক ম্যাচের গল্প। স্মরণীয় গোলগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করছেন কেউ কেউ। তেমনই একটি গোলের স্মৃতি আজও আপ্লুত করে শেখ মোহাম্মদ আসলামকে। দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই গোলসহ জাতীয় দলের সাবেক এই স্ট্রাইকার কথা বললেন বাংলাদেশ–ভারত ফুটবল দ্বৈরথ নিয়ে—
বিজ্ঞাপন
ভারতের বিপক্ষে আপনার করা ১৯৮৫ সালের সাফ গেমস ফাইনালের গোলটি এখনো অনেকের চোখে ভাসে। আপনারও নিশ্চয়ই মনে আছে গোলটির কথা…
শেখ মোহাম্মদ আসলাম: ভীষণ মনে আছে। বাংলাদেশের রক্ষণে তখন ছিলেন কায়সার, জনি, রণজিৎ, ইউসুফ ভাই। মাঝমাঠে আশীষ, ওয়াসিম, খুরশিদ বাবুল। আক্রমণে আমি, মামুন বাবু, বাদল রায়। গোলকিপার মহসিন। ঢাকা স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শক বাংলাদেশের জয় দেখতে উদগ্রীব ছিল। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় উপহার দিতে পারিনি।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের জয়ের সামর্থ্য আছে। কিন্তু মাঠে নামার আগেই মানসিকভাবে হারা যাবে না। আমরা জিততে পারি—এই আত্মবিশ্বাস থাকা দরকার। জয়ের জন্য আক্রমণাত্মক খেলতে হবে। রক্ষণাত্মক খেললে হবে না। রক্ষণাত্মক মানসিকতার কারণেই আফগানদের বিপক্ষে আমরা জিততে পারিনি।
আসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল সম্পর্কে
হ্যাঁ, গোল করার আগেই তো আপনারা গোল খেয়ে গেলেন…
আসলাম: সেটা ছিল খুবই হতাশার। আমরা হঠাৎ গোল খেয়ে যাই। গোলটা করেছিল শিশির ঘোষ। সেই গোল খাওয়ার পর দর্শকদের মন খারাপ হয়ে গেল। তখন দর্শকের আবেগ ছিল অন্য রকম। পারলে মাঠে নেমে দর্শকেরা আমাদের কাছে কৈফিয়ত চায় কেন গোল খেলাম!
আপনার গোলে ম্যাচে ফিরে সেদিন জয়ের স্বপ্নও দেখছিল বাংলাদেশ…
আসলাম: হাজার হাজার দর্শকের চিৎকারে আমি খুবই উজ্জীবিত ছিলাম সেদিন। মাঠে ছিলাম লড়াকু সৈনিকের মতো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যেকোনোভাবেই হোক গোল করতে হবে। খুব সম্ভবত মাঝমাঠ থেকে বলটা আমাকে আশীষ ভদ্র বাড়িয়ে দেন। শরীরটাকে ঘুরিয়ে দেখলাম, ভারতের গোলকিপার অতনু ভট্টাচার্য একটু সামনে। তাই একটু এগিয়ে সম্ভবত ৪০-৪৫ গজ দূর থেকে আচমকা শট নিই পোস্টে। বুলেট গতির সেই শট এত জোরে জালে গোলে ঢুকল যে অতনুর পক্ষে ধরার উপায় ছিল না।
অতনু পরে এই গোল নিয়ে কিছু বলেছিলেন আপনাকে?
আসলাম: ও তখন ভারতের সেরা গোলকিপার। মাত্রই এশিয়ান অল স্টার টিমে খেলে এসেছে। ম্যাচের পর তেমন কথা হয়নি। তবে কয়েক বছর পর কলকাতার রাস্তায় হঠাৎ একদিন অতনু আমাকে জাপটে ধরে বলেছিল, ‘আসলাম, তুমি আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করে দিলে।’ সেদিন ম্যাচ শেষে ভারতের লেফট ব্যাকে খেলা কৃষেন্দু রায় বলেছিল, ‘এত দূরপাল্লার শট আমি আগে দেখিনি।’ পরে ইস্টবেঙ্গলে খেলতে গেলে ওরা আমাকে এই গোল নিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেছে।
বাংলাদেশের প্রথম ‘বিশ্বকাপ’ দল। দাঁড়ানো (বাঁ দিক থেকে) জনি, ইলিয়াস, বাতেন, চুন্নু, আজমত, অলোক। বসা (ডান দিক থেকে) মহসিন, ওয়াসিম, খুরশিদ বাবুল, আসলাম, আশীষ ভদ্র।
ফাইনালে জিততে না পারার হতাশাটা কেমন ছিল?
আসলাম: খুবই দুঃখের দিন ছিল সেটা। ১-১ ড্র শেষে টাইব্রেকারে আমরা হেরে গেলাম ৪-১ গোলে। টাইব্রেকারে সেদিন কী যে হয়েছিল আমাদের, আজও ধাঁধা লাগে। ইউসুফ ভাই, জনি আর আমি মিস করলাম। একটা সমস্যা হয়েছিল। আমার শটের আগে ভারতীয় গোলকিপার মুভ করে। রেফারি বিষয়টা এড়িয়ে যান। কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ায় উচিত হয়নি। যা–ই হোক, ফাইনালে হারলেও আমরা খুব সম্মান নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলাম সেদিন।
একটা কথাই বলব, সাহস নিয়ে খেললে তোমরা ভারতের সঙ্গে জিতবে। ভারত ভালো দল ঠিক আছে। তবে শারীরিকভাবে অতটা এগিয়ে নেই ওরা। আমি মনে করি, ভারতের বিপক্ষ জিততে পারে বাংলাদেশ, তবে আক্রমণাত্মক খেলতে হবে।
আসলাম, জামাল ভূঁইয়াদের সাহস দিয়ে
আপনাদের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের আবহ কেমন ছিল?
আসলাম: ভারতের সঙ্গে খেলায় আমাদের মানসিকতা ছিল—এই ম্যাচে যে কেউ জিততে পারে। তখন ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারি মানেই ছিল অন্য রকম একটা ব্যাপার। গ্যালারিতে আনন্দ-বেদনা সবই ছিল।
ওই সময় ভারতীয় দল মানেই ছিল পশ্চিম বাংলার একঝাঁক ফুটবলার। সুদীপ চ্যাটার্জি ছিলেন অধিনায়ক। কৃষানু দে, শিশির ঘোষ, বাবু মানি, বিকাল পাঁজি, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যরা ছিলেন দলের বড় শক্তি। সেই দলের বিপক্ষে খেলার কোন স্মৃতিটা আপনার বেশি মনে পড়ে?
আসলাম: স্মৃতি তো অনেক! ভারতীয় দল মানেই তখন বাংলা ভাষাভাষীদের জোয়ার। পশ্চিম বাংলার ফুটবলাররা শাসন করত ভারতের ফুটবল। মনে আছে বিকাশ পাঁজি, বাবু মানিরা আমাকে বলেছিল, ‘তোকে তো আটকানো যায় না রে…।’ বিকাশের আদি বাড়ি বাগেরহাট।
দোহায় ভারতের সঙ্গে ৭ জুন জিততে পারবে বাংলাদেশ? কী মনে হয় আপনার?
আসলাম: আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের জয়ের সামর্থ্য আছে। কিন্তু মাঠে নামার আগেই মানসিকভাবে হারা যাবে না। আমরা জিততে পারি—এই আত্মবিশ্বাস থাকা দরকার। জয়ের জন্য আক্রমণাত্মক খেলতে হবে। রক্ষণাত্মক খেললে হবে না। রক্ষণাত্মক মানসিকতার কারণেই আফগানদের বিপক্ষে আমরা জিততে পারিনি।
সবাই ধরে নিয়েছিল আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ হারবে। এ কারণেই হয়তো কোচ আগেই রক্ষণাত্মক ছিলেন। আপনার কী মনে হয়?
আসলাম: এটা হতে পারে। তবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিরতির পর যেভাবে খেলেছে বাংলাদেশ, এই খেলাটা প্রথম থেকে খেললে ভালো হতো। আমার মনে হয় প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক খেলা উচিত ছিল। আমরা শুরুতেই রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ি। মনে হয়, খেলার আগেই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম এবং এক পয়েন্ট নেওয়ার জন্য নেমেছিলাম। ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস ছিল না যে ওরা ভালো খেলতে পারে। যখন আক্রমণাত্মক খেলতে শুরু করল, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে ড্র করায়ও আমি খুশি।
ভারত ম্যাচের আগে জামাল ভূঁইয়াদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ?
আসলাম: একটা কথাই বলব, সাহস নিয়ে খেললে তোমরা ভারতের সঙ্গে জিতবে। ভারত ভালো দল ঠিক আছে। তবে শারীরিকভাবে অতটা এগিয়ে নেই ওরা। আমি মনে করি, ভারতের বিপক্ষ জিততে পারে বাংলাদেশ, তবে আক্রমণাত্মক খেলতে হবে।