সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:১০ পূর্বাহ্ন

মহানবীর প্রতি ভালোবাসা

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৬০ জন নিউজটি পড়েছেন

ভালোবাসা মানুষের মানবিক বৈশিষ্ট্য, সহজাত প্রেরণা। প্রকৃতিগতভাবে মানুষ বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন,আত্মীয়স্বজনকে ভালোবাসে। তবে আত্মীয়তার বাইরেও মানুষ মানুষকে ভালোবাসে তার বিশেষ যোগ্যতা ও গুণের কারণে। এই জগতসংসারে এমন বহু মানুষ গত হয়েছেন, যারা তাদের বিশেষ গুণ ও অবদানের কারণে দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তাবৎ মানুষের ভালোবাসার রাজ্য দখল করে আছেন। কেউ মানবসেবার কারণে, কেউ ন্যায়পরায়ণতার কারণে, কেউ বীরত্ব ও সাহসিকতার কারণে, কেউ জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে, কেউ বা শিল্পসাহিত্যে বিশেষ অবদান রেখে মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। ইতিহাসের পাতায় এমন হাজারো কালজয়ী ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, যাদের মানুষ যুগ যুগ ধরে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। কিন্তু আল্লাহর গয়গম্বরগণের মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে।
তাঁদের সাথে জগতের অন্য কাউকে তুলনা করা যায় না। তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যে মনুষ্যত্বের যাবতীয় গুণ পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। আর বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর মধ্যে প্রত্যেক পয়গম্বরের গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সমাহার ঘটেছিল। সুতরাং বিশ্বনবী সা:-এর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা প্রত্যেক মানুষের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। এটি মানবতা ও প্রকৃতির দাবি। কেননা যেসব কারণে মানুষ মানুষকে ভালোবাসে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ তিনটি। তা হচ্ছে, যোগ্যতা, সৌন্দর্য ও অনুগ্রহ। ভালোবাসার এই উপকরণগুলো মহানবী সা:-এর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এখানে সংক্ষিপ্তভাবে এগুলোর বিশ্লেষণ তুলে ধরছি :
১. কামালিয়াত বা যোগ্যতা : জগতের মানুষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু আল্লাহর পয়গম্বরগণ জাগতিক কোনো প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেননি। তাঁরা জিবরাঈল ফেরেশতা কর্তৃক সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। সহিহ বোখারির বর্ণনায় রয়েছে, জিবরাঈল আ: প্রথম যখন এসে মহানবী সা:-কে বললেন, ‘ইকরা’ আপনি পড়–ন, রাসূল সা: বললেন, ‘আমি তো পড়তে শিখিনি।’ তখন জিবরাঈল আ: স্বীয় বুকের সাথে রাসূল সা:-কে জড়িয়ে ধরেন। তাতে নবীজী সা:-এর বক্ষ ঐশী জ্ঞান ধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়। তিনি এরশাদ করেছেন, ‘আমি জ্ঞানের শহর আর এই শহরের দরজা হলো আলী’। রাসূল সা: শুধু জ্ঞানের ক্ষেত্রে নয় বরং তিনি ছিলেন সর্বক্ষেত্রে পরিপূর্ণ গুণের অধিকারী।
আমাদের প্রিয় নবী সা: ছিলেন উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর উন্নত চরিত্রের প্রশংসা করেছেন। এরশাদ হয়েছেÑ ‘নিশ্চয়ই আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা কলম : ৪) মহানবী সা: বলেন, ‘আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতাদানের নিমিত্তে জগতে প্রেরিত হয়েছি।’ (সুনানে বায়হাকি : ২০৫৭১) তিনি কাউকে সিদ্দিক বানিয়েছেন। কাউকে দানবীর বানিয়েছেন। কাউকে ন্যায়পরায়ণ বানিয়েছেন। তাঁর অনুপম শিক্ষা পেয়ে আরবের বর্বর মানুষেরা সোনার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন।
২. সৌন্দর্য : মহানবী সা: ছিলেন সুন্দরের রাজা। রাসূলকে যারা দেখেছেন তারা তাঁর সৌন্দর্যকে চাঁদ ও সূর্যের সাথে তুলনা করেছেন। হজরত জাবের ইবনে সামুরা রা:-কে জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, নবীজীর সৌন্দর্য কি তরবারির ন্যায় চকচক করত? তিনি বললেন, না। বরং তাঁর সৌন্দর্য ছিল চন্দ্র ও সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল। আবু হুরায়রা রা: বলেন, ‘আমি রাসূল সা:-এর চেয়ে সুন্দর কিছু দেখিনি। তাঁর চেহারায় যেন সূর্য চিকচিক করত।’ (শামায়েলে তিরমিজি) হজরত কাব ইবনে মালেক রা: বলেন, রাসূল সা: যখন আনন্দিত হতেন, তখন মনে হতো তাঁর চেহারায় এক টুকরো চাঁদ হাসছে।’ (মুস্তাদরাক) সুতরাং সৌন্দর্যের কারণে যদি কাউকে ভালোবাসতে হয়, তাহলে এই ভালোবাসার সবচেয়ে হকদার বিশ্বনবী সা:।
৩. সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ : অনুগ্রহশীল ব্যক্তির প্রতি স্বভাবগতভাবে মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। প্রবাদে আছে, ‘মানুষ অনুগ্রহের দাস।’ এই বাস্তবতাকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। সুতরাং এই পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পরে মানবজাতির ওপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহকারী ব্যক্তিটি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:। তাঁর অস্তিত্বই মানবতার জন্য সাক্ষাৎ অনুগ্রহ। আল্লাহ পাক তাঁকে জগতবাসীর জন্য করুণার আধার বানিয়ে প্রেরণ করেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে জগতবাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৭) নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্ব থেকেই রাসূল সা: সমাজের অসহায়, অনাথ এবং দুঃখী মানুষের সেবা করতেন। নিজে উপার্জন করে অভাবী, অনাহারি মানুষের মুখে তুলে দিতেন। বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতেন। নিজের কাছে টাকা-পয়সা না থাকলে ঋণ করেও মানুষের প্রতি দান-খায়রাত করেছেন। এসবই ছিল তাঁর জাগতিক সাহায্য-সহযোগিতা। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ ছিল, মানুষকে আখেরাতের বিপদ থেকে রক্ষা করা। জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচানোর চিন্তা তাঁকে অস্থির করে তুলত। তিনি বলেছেন, ‘আমার দৃষ্টান্ত হলো ওই ব্যক্তি মতো, যে আগুন প্রজ্ব¡লিত করেছে। আর সে আগুনে অবুঝ পঙ্গপাল ঝাঁপ দিয়ে মারা যাচ্ছে। সে ব্যক্তি পঙ্গপালকে বাধা দিয়ে পারছে না। তেমনি আমিও তোমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁধা দিচ্ছি।’ (বোখারি ও মুসলিম) পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের কাছে এসেছে একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তাঁর পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মোমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।’ (সূরা তাওবা : ১২৮) সুতরাং মহানবী সা:-এর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন শুধু এই উম্মতেরই করণীয় নয় বরং জগতের প্রতিটি ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। তাঁর ভালোবাসা ইনসাফের দাবি। প্রকৃতির দাবি।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English