বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের পদবি পরিবর্তন ও পদোন্নতি হয়নি প্রায় দুই যুগ ধরে। ফলে চাকরিজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই পদে কাজ করছেন মাঠ প্রশাসনের হাজার হাজার কর্মচারী। পদোন্নতি বঞ্চনার কষ্ট নিয়েই তাদের যেতে হচ্ছে অবসরে কিংবা পরপারে। মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ কালেক্টরেট সহকারী সমিতি (বাকাসস) এই বৈষম্যের অবসান চেয়ে দুই দশক ধরে আন্দোলন করে আসার পর ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন দেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মাঠ প্রশাসনের ১১-১৬ গ্রেডভুক্ত কর্মীদের পদবি পরিবর্তনের জন্য সম্প্রতি এক চিঠিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গড়িমসির কারণে তাদের পদপদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব ঝুলে আছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরও দাবি বাস্তবায়নে বিলম্বিত হওয়ায় আগামী ২৪ জানুয়ারি থেকে টানা কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীরা। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের আগে প্রায় সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) কর্মচারীদের পদোন্নতির পক্ষে সুপারিশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীরা বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সহযোগী হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠ প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের পর মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীদের পদবি ও বেতন গ্রেড উন্নীত হলেও একই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকার পরও তাদের পদবি ও বেতন গ্রেডের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ১১-১৬ গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের বর্তমান পদ পরিবর্তন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও সহকারী ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ করেন তারা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া পর্যালোচনা-সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি জাফর ইকবাল বলেন, এ কাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। রাতারাতি কিছু করা যাবে না। তবে এ বিষয়ে কাজের অগ্রগতি হচ্ছে।
বাকাসস সভাপতি আকবর আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ধীরে চলো নীতির কারণেই আমরা টানা আন্দোলনে যাচ্ছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি চলমান থাকবে। তাদের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ২৪ জানুয়ারি সকাল ৯টায় হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিসের প্রধান ফটকে অবস্থান। এরপর থেকে টানা কর্মবিরতি চলবে। এর আগে তারা ৩ জানুয়ারি থেকে টানা কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শনিবার বাকাসসের এক জরুরি বৈঠকে কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত বাকাসসের একাধিক নেতা বলেন, গত ১ জানুয়ারি ঢাকা অফিসার্স ক্লাবে জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে জনপ্রশাসন সচিব জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাদের কাজ নিষ্পন্ন করা হবে। এ জন্য তাদের কর্মসূচি স্থগিত করার অনুরোধ করেছেন তিনি। বাকাসস নেতারা আরও বলেন, সচিবের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করেছেন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জনপ্রশাসন সচিবের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দাবি বাস্তবায়ন না হলে ২৪ জানুয়ারি থেকে আবার টানা কর্মবিরতি শুরু হবে।
এর আগেও গত ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর তারা পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নভেম্বরের প্রথম পক্ষের গোপনীয় প্রতিবেদনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা প্রস্তাব তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়েছে, কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করায় মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমসহ জনসেবা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করার জন্য জনপ্রশাসন সচিবকে চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীদের দাবি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। শিগগিরই তাদের পদবি পরিবর্তন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই পরিবর্তনের সারসংক্ষেপ অনুমোদন করেছেন।
দপ্তর-অধিদপ্তরেও বৈষম্য :একইভাবে প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে বৈষম্য চলছে সচিবালয়ের প্রধান সহকারী, সহকারী ও উচ্চমান সহকারীদের সঙ্গে বাইরের সরকারি দপ্তর-অধিদপ্তরের কমর্চারীদের। বঞ্চিত কমর্চারীরা এই বৈষম্যের অবসান চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবরও স্মারকলিপি দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দাবি বাস্তবায়নে বহুবার সুপারিশ করেছে। বিভিন্ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকরাও (ডিজি) পদোন্নতির পক্ষে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছেন। ডিজিদের সুপারিশ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসনে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো সমাধান করেনি। এমন পরিস্থিতিতে কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সারাদেশে বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরে কলম বিরতি কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এই দাবির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন সংহতি ও সমর্থন জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ ডিসেম্বর সরকারি কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া পর্যালোচনা-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদের মহাসচিব আবু নাসির খান বলেন, সচিবালয়ের ভেতরে-বাইরে সরকারি দপ্তরের প্রধান সহকারী, সহকারী, উচ্চমান সহকারী সমপদের পদবি এবং বেতন স্কেল এক ও অভিন্ন ছিল। ১৯৯৫ সালের প্রজ্ঞাপন দিয়ে শুধু সচিবালয়ের বর্ণিত পদগুলো প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদবিসহ ১০ নম্বর গ্রেডে উন্নীত করা হয়। ফলে সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে পদবি ও বেতন বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। এই বৈষম্য নিরসনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির একাধিক সুপারিশ সত্ত্বেও সমপদে কর্মরত কর্মচারীরা আগের পদবি ও বেতন স্কেলে রয়ে গেছেন। বাধ্য হয়ে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন।