সব মানুষ নবীজি (সা.)-এর কাছে ঋণী। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম। তিনিই উম্মতকে নিঃস্বার্থ ভালোবেসেছেন। বিশ্বকে মানবতা শিখিয়েছেন। বর্বরতার যুগ সোনালি যুগে পরিণত করেছেন। ঘোর ইসলামবিরোধীও তাঁর কাছে ইনসাফ পেয়েছে, সহযোগিতা পেয়েছে। তিনিই সততা-আমানতদারি শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে অমুসলিমরাও অর্থ-সম্পদ আমানত রেখেছে। বহু অমুসলিম দার্শনিক পৃথিবীর ‘শ্রেষ্ঠ মানুষের তালিকায়’ এক নম্বরে তাঁর নামই এনেছেন। তিনি হাত ধরে ধরে মানুষকে জাহান্নামের কিনারা থেকে রক্ষা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘…তোমরা তো অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করেছেন…।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩)
ঈমানদারদের কাছে নবী তাদের জানের চেয়ে প্রিয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ…।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৬)
নবীজি (সা.)-এর ইজ্জত রক্ষা করা ওয়াজিব : নবীজি (সা.)-এর প্রতি ঈমানের পাশাপাশি তাঁর তাজিম ও ইজ্জত-সম্মানও ওয়াজিব। তাতে সামান্যতম শিথিলতার সুযোগ নেই। তাঁর শানে বাজে কথা বলা, তাঁকে অপমান-অপদস্ত করা, কোনো দ্বিনি বা ব্যক্তিগত ব্যাপারে দোষারোপ করা অথবা তাঁর সত্তাগত কোনো বৈশিষ্ট্যে দোষ খোঁজা বা তাঁর শানে বেয়াদবি করা কুফুরি। এ ব্যাপারে চার ইমামই একমত। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৮৬)
কাব বিন আশরাফের মৃত্যুদণ্ডের কারণ : তৃতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। নবীজি (সা.) তখন জীবিত। কাব বিন আশরাফ নামক ইহুদি নবীজি (সা.)-এর শানে অমার্জিত কথাবার্তা বলতে থাকে। তাঁর শানে কুৎসামূলক কবিতা আবৃত্তি করে। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করে। নবীজি (সা.)-কে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজ করতে থাকে। ফলে নবীজি (সা.) তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার নির্দেশ দেন। মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা.) কয়েকজন সাহাবির সহযোগিতায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। (বুখারি : ২/৫৭৬-৫৭৭, সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/৫১-৫৭, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৬-১১)
আবু রাফের মৃত্যুদণ্ডের কারণ : ৫ম হিজরি মোতাবেক ৬২৭ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। নবীজি (সা.) তখনো জীবিত। আবু রাফে একজন ধনী ব্যবসায়ী ও ইহুদি। সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন কটূক্তি করত। তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিত। আবদুল্লাহ বিন আতিক (রা.)-সহ কয়েকজন সাহাবি নবীজি (সা.)-এর কাছে তার ব্যাপারে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করলেন। তিনি আবেদন মঞ্জুর করলেন। আবদুল্লাহ বিন আতিক (রা.) কয়েকজন সাহাবির সহযোগিতায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। (বুখারি : ২/৫৭৭-৫৭৮, সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/২৭৩-২৭৫, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/১৫৬-১৬০)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তিরস্কারকারীর বিধান : যদি কেউ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে ভর্ৎসনা, তিরস্কার বা অপবাদ ইত্যাদি দিয়ে ইসলামের ওপর আঘাত হানে তাহলে সে মুরতাদ হিসেবে গণ্য হবে। তার জন্য ভুল স্বীকার করে তাওবা করে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করা আবশ্যক। অন্যথায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা সরকারের দায়িত্ব। নচেৎ সকল মুসলমানের দায়িত্ব হবে তাদের বয়কট করা। আর যারা তাদের সমর্থন করবে তাদেরও একই বিধান। (রদ্দুল মুহতার : ৪/২৩১, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৭/৩০৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাল্পনিক ছবি ও ব্যঙ্গচিত্র আঁকা : নবীজি (সা.)-এর অবমাননা কুফুরি। মুখে হোক কিংবা ছবি এঁকে। বিশেষত তাঁর ছবি এঁকে প্রকাশ করাও প্রকাশ্য নবিদ্রোহিতা। সুতরাং এ ধরনের বেয়াদব, নবিদ্রোহির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ওপর ফরজ। আর এরূপ কুফুরি কাজ থেকে প্রকাশ্যে তাওবা না করা পর্যন্ত সাধারণ মুসলমানের জন্য তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৮৬)
কুশপুত্তলিকা দাহ : কোনো ব্যক্তির প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশান্তে তাকে অপমানের জন্য তার কুশপুত্তলিকা দাহ করার পদ্ধতি শরিয়তসম্মত নয়। এ পদ্ধতি বর্তমানে প্রচলিত পাশ্চাত্য রাজনীতিকদের উদ্ভাবিত। তবে নবীজি (সা.)-কে কেউ অপমান করলে অবশ্যই অপমানকারী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উপযুক্ত। এমন লোকের প্রতি শরিয়তসম্মত পন্থায় ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রদর্শন ঈমানি কর্তব্য। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৫১, ফাতাওয়া ফকীহুল মিল্লাত : ১/৩২৬)