মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রখ্যাত অভিনেত্রী ববিতা পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার বাসাতেই অবস্থান করেছিলেন পুরো ৯ মাস। এ সময়টায় তিনি কোনো সিনেমার শুটিংয়ে গোপনেও অংশ নিতে পারেননি। তাছাড়া তার বাবারও অনুমতি ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ববিতা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাংলাদেশি জাতির গর্বের ইতিহাস। এ যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রিয়জনদের। আমাদের পরিবারও হারিয়েছে এ দেশের মেধাবী সন্তান ও জাতির গর্ব জহির রায়হান অর্থাৎ আমার বড় বোনের স্বামীকে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আপা (সুচন্দা) এবং দুলাভাই কলকাতায় চলে যান। এই জহির ভাইয়ের খোঁজেই পাক আর্মিরা প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসত। আব্বাকে জিজ্ঞেস করত, জহির ভাই কোথায়? আব্বা বলতেন, জানি না। আমরাও তাকে খুঁজছি। যুদ্ধ শুরুর আগেই কিন্তু আমি সিনেমার নায়িকা হয়েছি। পাক আর্মিরা আমার কথাও জিজ্ঞেস করতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে ছিল একটি ফ্রন্ট গেট, আরেকটি ব্যাক গেট। যখন পাক আর্মিরা বাসায় আসত আমাদের খোঁজে, তখন আমি, চম্পা ও আমার ভাই- আমরা সবাই ব্যাক গেট দিয়ে বের হয়ে অন্য বাড়িতে লুকিয়ে থাকতাম।
এভাবেই ভীষণ আতঙ্কের মধ্য দিয়েই আসলে কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়। প্রতিদিন নানা ধরনের খারাপ খবর আসত। কাছের মানুষের মৃত্যু সংবাদ আসত। আব্বার ভীষণ মন খারাপ হতো। আমাদেরও মন খারাপ হওয়ার পাশাপাশি ভয়ও ছিল, কখন কী হয়।
গেণ্ডারিয়ার বাসা থেকেই দেশ স্বাধীনের খবর শুনেছিলাম। সেই খবর শোনার মুহূর্তটি এখনও চোখে উজ্জ্বল। মাঝে আটচল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে, ভাবাই যায় না। সময় এত দ্রুত চলে যায়, তা মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল থেকে এখন পর্যন্ত ভাবলেই শিহরিত হই আমি। বাংলার সূর্য সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সব বীরাঙ্গনাদের প্রতি রইল আমার পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।’
ববিতা জানান, মুক্তিযুদ্ধের আগেই মুস্তফা মেহমুদের ‘মানুষের মন’ নামের একটি সিনেমার শুটিং করেছিলেন তিনি। এতে তার বিপরীতে ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। মুক্তিযুদ্ধের পর পরই শুটিং শেষ করার মধ্য দিয়ে সিনেমাটি মুক্তি দেয়া হয়। এই ‘মানুষের মন’-ই ছিল স্বাধীন বাংলার মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম সিনেমা। মুক্তিযুদ্ধের আগেই ববিতা নায়িকা হিসেবে নায়করাজ রাজ্জাকের বিপরীতে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমার মাধ্যমে অভিষিক্ত হন।
১৯৭০ সালে তার অভিনীত এহতেশাম পরিচালিত ‘পিচ ঢালা পথ’ ও নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘স্বরলিপি’ নামে দুটি সিনেমা মুক্তি পায়। দেশ স্বাধীনের পর সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ সিনেমায় অভিনয় করেন ববিতা। ১৯৭২ সালের ৮ নভেম্বর এটি মুক্তি পায়। এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পের সিনেমা। ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’, আলমগীর কবিরের ‘কোয়াইট ফ্লু দ্য মেঘনা’ ও ইউসুফ জহিরের ‘ইয়ে করে বিয়ে’ মুক্তি পায়।
ববিতার লিপে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া বহুল জনপ্রিয় ‘এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে আর ঝরে’ গানটি নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘আলোর মিছিল’ সিনেমার। এটি মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৫ সালে শুরু হল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রথা।
সে বছরই মুক্তিপ্রাপ্ত ববিতা অভিনীত মোহসীন পরিচালিত ‘বাদী থেকে বেগম’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ববিতা প্রথমবারই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ সিনেমায় এবং এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৭ সালে সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়ে টানা ৩ বছর পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে হ্যাটট্রিক করেন ববিতা।