সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ন

মুজিববর্ষে প্রত্যাশা…

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ৯ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪৯ জন নিউজটি পড়েছেন

বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধু এ বছর ১০০ তে পা রাখতেন। তার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বছর জুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন’। প্রিন্ট মিডিয়াও প্রকাশ করছে বিশেষ সংখ্যা।

দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটা করছেন। মুজিববর্ষকে সামনে রেখে ব্যক্তি পর্যায়েও কেউ কেউ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন। করোনা মহামারির কারণে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিলের পাশাপাশি বছরব্যাপি অনুষ্ঠানমালাতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। গণজমায়েত পরিহার করে ভার্চুয়াল মাধ্যমে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানগুলো অনাড়ম্বরভাবে উদযাপন করা হচ্ছে।

নিজের জন্মদিন নিয়ে ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছিলেন, ‘আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। এইদিনে ১৯২০ সালে পূর্ববাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই- বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটা উপহার দিয়ে থাকতো। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দী আছি বলেই। আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস! দেখে হাসলাম।’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা-২০৯)।

ওই জন্মদিনে সহবন্দিরা বঙ্গবন্ধুকে ফুল দিয়েছিলেন, কারাগারে কেক নিয়ে এসেছিলেন বেগম মুজিব আর তাদের ছেলেমেয়েরা। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচায় লিখেছেন, ‘তখন সাড়ে চারটা বেজে গিয়েছে, বুঝলাম আজ বোধহয় রেণু ও ছেলেমেয়েরা দেখা করার অনুমতি পায় নাই। পাঁচটাও বেজে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে জমাদার সাহেব বললেন, চলুন আপনার বেগম সাহেবা ও ছেলেমেয়েরা এসেছে। তাড়াতাড়ি কাপড় পরে রওনা করলাম জেলগেটের দিকে। ছোট মেয়েটা আর আড়াই বৎসরের ছেলে রাসেল ফুলের মালা হাতে করে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা নিয়ে রাসেলকে পরাইয়া দিলাম। সে কিছুতেই পরবে না, আমার গলায় দিয়ে দিল। ওকে নিয়ে আমি ঢুকলাম রুমে। ছেলেমেয়েদের চুমা দিলাম। দেখি সিটি আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়েছে। রাসেলকে দিয়েই কেক কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেল গেটের সকলকে কিছু কিছু দেয়া হলো। কিছুটা আমার ভাগ্নে মণিকে পাঠাতে বলে দিলাম জেলগেটে থেকে। ওর সাথে তো আমার দেখা হবে না, এক জেলে থেকেও।’ (পৃষ্ঠা- ২১০)।

বঙ্গবন্ধু নিজে জন্মদিন পালন না করলেও তার জন্মশতবার্ষিকীতে পুরো বাংলাদেশ ও বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশের বাঙালি সম্প্রদায় একাট্টা হয়েছে বিশেষ এই দিনটিকে উদযাপনের জন্য। তাই বছরটিকে ঘোষণা করা হয়েছে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মস্থল পর্যন্ত বৃক্ষরোপন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। লাগানো হয়েছে এক কোটি চারাগাছ। এটি যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ। ভেবে শিহরিত হই, ২০২০ সালে মুজিববর্ষে যে বৃক্ষচারাগুলো রোপন করা হয়েছে কালক্রমে টিকে থাকা সেই বৃক্ষরাজিতে সুশোভিত হবে বাংলাদেশ। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সড়ক-মহাসড়কের পাশে কিংবা উন্মুক্ত প্রান্তরে বেড়ে ওঠা গাছগুলো দেশের ২৫ ভাগ বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই মেটাতে সহায়তা করবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে অল্প পরিসরে হলেও বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিনামূল্যে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। তবে, আয়োজনের ব্যাপ্তি আরো বেশি হলে মন্দ হতো না। রাজনীতির প্রথমপাঠ হিসেবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এটি বিনামূল্যে বিতরণের সুযোগ এখনো রয়েছে। কাজটি কীভাবে করা যেতে পারে- সেটি সংশ্লিষ্টরা ভেবে দেখতে পারেন। কৃষক-মজুরদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ ছিল প্রধানমন্ত্রী সে কথা প্রায়ই বলে থাকেন। তাদের সম্মান করে কথা বলার বিষয়টি মনে করিয়ে দেন দলের নেতাকর্মিদের। এমন নৈতিক শিক্ষা শিশুরা স্কুল শিক্ষকদের কাছ থেকেও পেতে পারে।

মুজিববর্ষে যুবক ও তরুণ বিশেষত রাজনীতিতে যারা নতুন মুখ- তাদের জন্য বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ অবশ্যই পঠনীয়। নদীবেষ্টিত গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার খোকা কীভাবে বাঘা বাঘা নেতাকে পেছনে ফেলে নেতৃত্বের শীর্ষে উঠে এসেছিলেন, এমন কি মহৎ কাজ করেছিলেন- যার জন্য সাত কোটি বাঙালির ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন তিনি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখাগুলোর কাছেই আমাদের ভাবি প্রজন্মকে ফিরে যেতে হবে।

রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত ‘তৃণমূল’ আসলে কারা? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার দলের নেতাকর্মিদের ওই তৃণমূলের কাছে যাওয়ার কথা বলেন। তাদের খোঁজ-খবর নেয়ার কথা বলেন। এই তৃণমূলের কথা বঙ্গবন্ধুও বলে গেছেন। শুধু বলেই যাননি। বাংলার ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের দুঃখে দুঃখী হয়েছেন। শুধু নির্বাচনকালিন নয়, সারাবছরই তিনি গণসংযোগ করতেন। মানুষের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন করতেন। ফলশ্রুতিতে তাকে জেলেও থাকতে হতো বছরের বিভিন্ন সময়।

বিশ্বমানের নেতা হয়েও তিনি সাদামাটাভাবে ভালোবেসে মিশে গিয়েছিলেন বাঙালির সঙ্গে। সেই ভালোবাসার প্রতিদানও বাঙালি তাকে দিয়েছিল ৭ মার্চে তার আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিজের জীবন উৎসর্গ করে। সর্বোপরি বিবিসির জরিপে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে পেছনে ফেলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিও নির্বাচিত হয়েছেন তিনি সারা বিশ্বের বাঙালিদের ভোটে। বলা হয়ে থাকে, সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথ বিচরণ করেননি। তেমনি সততার রাজনীতির সব শাখাতেই বঙ্গবন্ধুকে উপমা হিসেবে তুলে ধরা যায় অনায়াসে। শৈশব থেকে যৌবন, পরিণত- সব বয়সের রাজনীতিতে।

তরুণদের জানতে হবে- একটি সংস্কৃতিমনা পরিবার যার প্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি নিজেও এক সময় ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তার জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল জেনেটিক কারণেই খেলাধুলার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তার জুড়ি ছিল না। এমন একজন মানুষকে নিয়ে কারা, কী কারণে কুৎসা রটিয়ে যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল তাদের চিনতে হবে। তাদের সম্পর্কে জানতে হবে। প্রায় ৫৬ বছরের জীবনে বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন ৪ হাজার ৬৮২ দিন (জীবনের এক-চতুর্থাংশ)। আদর্শের রাজনীতি ও বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যই তাকে বিভিন্ন সময় জেলে যেতে হয়েছে। মুজিববর্ষকে সামনে রেখে এসব জানতে হবে। জানানোর চেষ্টা করতে হবে।

মুজিববর্ষে বছরজুড়ে সরকারিভাবে ২৯৪টি বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছিল। পরবর্তী সময় করোনা পরিস্থিতির কারণে তাতে অনেক পরিবর্তন আনা হয়। তবে, এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ (মুজিববর্ষের সময়কালের মধ্যে সব উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে সারাদেশের ঘরে ঘরে আলো পৌঁছে দেয়া কর্মসূচি), ‘সবার জন্য ঘর’ (মুজিববর্ষে এটিও প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত একটি কর্মযজ্ঞ- যাতে বলা হয়েছে, একটি মানুষও যেন গৃহহীন না থাকে) উল্লেখ করার মতো।

এছাড়াও, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিতে মুজিববর্ষে দেশের উপজেলা অফিসগুলোতে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মুজিববর্ষে দেশের ১৬টি উপজেলার দুই হাজার ১৬৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪ লাখ ১০ হাজার ২৩৮ শিক্ষার্থীর জন্য মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা এবং সারাদেশের ৪৮২টি উপজেলায় একযোগে এক কোটি গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হয় মুজিববর্ষ উপলক্ষে। মুজিববর্ষে কেউ যাতে বেকার না থাকে, সেজন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করে ‘বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ’ নামে একটি প্রকল্প চালুর ব্যবস্থা করেছে যুব মন্ত্রণালয়। যেখানে সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে সর্বাধিক পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনা জামানতে ঋণ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
উল্লেখিত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো অনেক কল্যাণকর কর্মসূচি নিয়ে মুজিববর্ষে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন, কেবলমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়নই নয়- এমনভাবে কাজ সমাধা করতে হবে, যেন এই বর্ষটিকে অনেক বছর পরেও সবাই মনে রাখে। এজন্য গৃহিত কাজগুলো যাতে আগামীতে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যায় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। মুজিববর্ষে সম্পাদিত কোনো কাজ নিয়ে যেন সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তীর্যক মন্তব্য না আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রকল্প ঘিরে যেন দুর্নীতি না হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

মুজিববর্ষকে সামনে রেখে সরকারের পরিকল্পনা মাফিক ২০২০ সালের শেষ দিকে স্বপ্নের পদ্মাসেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে তা পিছিয়ে যায়। একইভাবে করোনার কারণে কমে গেছে আধুনিক যোগাযোগের অপূর্ব নিদর্শন মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের গতিও। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে ‘ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা’র উদ্বোধন করেছেন। এটি মুজিববর্ষের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দৃষ্টিনন্দন এক্সপ্রেসওয়েটি দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে যাচ্ছেন মাওয়া-ভাঙ্গা এলাকায় পদ্মা নদীর কাছে।

২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া মুজিববর্ষ উদযাপন করা হবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত। আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে বাংলাদেশ। এতে করে মুজিববর্ষের সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর একটি মেলবন্ধন তৈরি হবে। দুইয়ের সমন্বয়ে অভূতপূর্ব এবং রোমাঞ্চকর কিছু উপভোগ করবো- সেই প্রত্যাশাই রাখি।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English