যেকোনো আদর্শ বা ধর্মের পক্ষে সমর্থনকারী ও অস্বীকারকারী লোক দুনিয়ায় থাকবেই, যা গণতন্ত্রের বিচারে স্বাভাবিক ব্যাপার। লক্ষাধিক নবী-রাসূলসহ আমাদের প্রিয় রাসূল সা:-এর নেতৃত্বে ইসলামকে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির ব্যাপারেও দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি মুসলিমদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছিল দুটি পক্ষ, যেমন প্রকৃত মুসলিম ও ভণ্ড মুসলিম বা মুনাফিক, যার বিবরণ রয়েছে পবিত্র কুরআন-সুন্নাহতে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা: মুসলিম ও কাফিরদের পরিচয়ের পাশাপাশি মুসলিম ও মুনাফিকদের পার্থক্য যেমন বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন, তেমনই তাদের দুনিয়া ও পরকালীন ভয়াবহ পরিণামের কথাও বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ প্রকৃত মুসলিমরা জান্নাতি হবে এবং ভণ্ড মুসলিম ও কাফিররা চিরতরে জাহান্নামে প্রবেশ করবে, এটাই আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
প্রকৃত মুসলিম তারাই, যারা আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহ-রাসূলের আদর্শ অনুযায়ী একমাত্র আল্লাহর দ্বীন কায়েমের পথে জীবনপাত করে। আর কাফির তারাই, যারা এর সম্পূর্ণ উল্টো। আবার ভণ্ড মুসলিম বা মুনাফিক তারাই, যারা মুসলিম দাবিদার এবং ইসলামের সুবিধাভোগী হয়েও আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর প্রতিনিধিত্ব পালনে প্রকাশ্য বা গোপনে অনীহা প্রকাশ কিংবা বিরোধিতা করে। অর্থাৎ তারা নামের মুসলিম, কাজের মুসলিম নয়।
মুসলিমের সংজ্ঞা : কালিমা তাইয়িবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই কিংবা কালিমা শাহাদাত ‘আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু’ অর্থাৎ আমি সাক্ষ্যদান করছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই। তিনি একক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্যদান করছি যে, নিশ্চয়ই হজরত মুহাম্মদ সা: আল্লাহর প্রেরিত বান্দা ও রাসূল’ কেউ এমনটি দাবি করলে যুদ্ধক্ষেত্রেও চরম শত্রুকে হত্যা করা হারাম। আর শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া নির্দোষ কোনো মুসলিমকে হত্যাকারী মুসলিম তো চিরজাহান্নামে নিক্ষেপিত হবে বলে উল্লেখ করেছেন আল্লাহ স্বয়ং। এক যুদ্ধে একজন শত্রুসৈন্য সম্মুখসমরে কালিমা পাঠ করলেও একজন সাহাবি তাকে হত্যা করেন। এর পর রাসূল সা: তাকে কৈফিয়ত তলব করে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, সে যে বেঈমান, তা কি তুমি তার বুক চিড়ে দেখেছিলে?
মুসলিমের সংজ্ঞা, পরিচয় ও চরিত্র : আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘সে-ই মুসলিম, যার জিহবা ও হাত থেকে সব মুসলিম নিরাপদ এবং সে-ই প্রকৃত মুহাজির, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন, তা সে ত্যাগ করে’ (৬৪৮৪; মুসলিম ১/১৪ হা: ৪০, আহমাদ ৬৭৬৫)। আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল সা:কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামের কোন জিনিসটি উত্তম? তিনি বললেন, ‘তুমি (ক্ষুধার্তকে) খাদ্য খাওয়াবে এবং চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দেবে’ (২৮, ৬২৩৬; মুসলিম ১/১৪ হা: ৪২, আহমাদ-৬৭৬৫)।
তবে চূড়ান্ত ইসলামবিরোধিতা এবং অন্যায়-অত্যাচারের পরিণতির কথা উল্লেখ করে স্বয়ং রাসূল সা:-এর চাচা ও চিহ্নিত কাফির আবু লাহাবের নামোল্লেখ ছাড়া আল্লাহ, রাসূল ও সাহাবারা কাউকে কখনো গালাগাল, বিদ্রƒপ বা বিভেদমূলক কথা প্রচার করেননি। এমনকি মুনাফিক নেতা আবদুুল্লাহ ইবনে উবাইকে আল্লাহ চিরজাহান্নামি ঘোষণা করলেও জীবিত বা মৃতাবস্থায়ও কেউ তাকে মুনাফিক বলে সম্বোধন, বিদ্রƒপ বা ফতোয়া দেননি। বরং হজরত ওমর রা:সহ বিশিষ্ট সাহাবিদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাসূল সা: নিজেই তার জানাজাসহ নিজের জামা দিয়ে তার কাফনের ব্যবস্থাও করেছিলেন। এটিই হচ্ছে ইসলামের মূল স্পিরিট, যা সব প্রকার অনুদারতা, কূপমণ্ডূকতা, বিভেদহীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বদলে দুনিয়ায় কল্যাণকেই সমুজ্জ্বল করেছে।
তবে ইসলামে ব্যক্তিগত ফতোয়াবাজির পরিবর্তে খিলাফতের বিচারপতি হিসেবে কাজীরাই আইনি বিচারসহ উদ্ভূত সমস্যার পক্ষে-বিপক্ষে রায় বা ফতোয়া দেয়ার অধিকারী ছিলেন। তাই ইসলামী খিলাফতের আওতার বাইরে ইসলামের ফৌজদারি ও দেওয়ানি দণ্ডবিধি-সংক্রান্ত ফতোয়া বা রায় দানের অধিকার কোনো মুসলিমের নেই, যদিও ইসলামের দণ্ডবিধি কার্যকরের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের চেষ্টা করাও ফরজ। অন্যথায় এ ধরনের মুসলিমকে আল্লাহ মুসলিম বলেই স্বীকার করেন কি না প্রশ্ন উঠে। কেননা, আল্লাহ বলেছেন ‘আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারাই কাফির। আর যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই জালেম’ (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৪৪-৪৫)। ‘আর যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই ফাসেক’ (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৪৭)।
যাই হোক, আল্লাহ কাফিরদের সংজ্ঞা, পরিচয় ও পরিণতি সম্পর্কে কী বলেন দেখা যাক ‘আর সে ব্যক্তির চেয়ে জালিম আর কে, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করে অথবা তার কাছে সত্য আসার পর তা অস্বীকার করে? জাহান্নামের মধ্যেই কি কাফিরদের আবাস নয়’ (সূরা আনকাবুত, আয়াত ৬৮)?
কাফির ও মুনাফিক নির্ণয়ের মানদণ্ড : একজন লোককে ‘কাফির’ কিংবা একজন মুসলিমকে ‘মুনাফিক’ হিসেবে চিহ্নিত করার ইসলামী মানদণ্ড একটাই। আর তা হলো পবিত্র কুরআন এবং রাসূলের সুন্নাহ, যেখানে ঈমান, মুনাফিকি ও কুফরির সংজ্ঞা দিয়েছেন আল্লাহ ও রাসূল সা:। আবার কে জান্নাতি মুসলিম, কে জাহান্নামি মুনাফিক ও কাফির, সেটি নির্ধারণের কোনো অধিকার মুসলিমদের নেই, শুধু ইসলামী বিচারব্যবস্থা ও যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া! ইসলামের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অগ্রসরমান কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকদের শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই হত্যার জন্য মুসলিমদের নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এর বাইরে কেউ শুধু মুনাফিক, কাফির, মুশরিক বা নাস্তিক বলেই তাকে উপহাস, গালাগাল, নির্যাতন বা হত্যা করা হারাম। এ ব্যাপারে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন ‘অবশ্যই সেসব মুনাফিক এই নির্দেশের আওতাভুক্ত নয়, যারা এমন কোনো জাতির সাথে মিলিত হয়, যাদের সাথে তোমরা (মুসলিমরা) চুক্তিবদ্ধ। এভাবে সেসব মুনাফিকও এর আওতাভুক্ত নয়, যারা তোমাদের কাছে আসে এবং যুদ্ধের ব্যাপারে অনুৎসাহিত, না তোমাদের বিরুদ্ধে লড়তে চায়, না নিজেদের জাতির বিরুদ্ধে। আল্লাহ চাইলে তাদের তোমাদের ওপর চাপিয়ে দিতেন এবং তারাও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন। কাজেই তারা যদি তোমাদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে আর তোমাদের দিকে সন্ধি ও সখ্যতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের ওপর হস্তক্ষেপ করার কোনো পথ রাখেননি। তোমরা আরেক ধরনের মুনাফিক পাবে, যারা চায় তোমাদের কাছ থেকে নিরাপদ থাকতে এবং নিজেদের জাতি থেকেও। কিন্তু যখনই ফিতনার সুযোগ পাবে, তারা তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এ ধরনের লোকেরা যদি তোমাদের সাথে মোকাবেলা করা থেকে বিরত না থাকে, তোমাদের কাছে সন্ধি ও শান্তির আবেদন পেশ না করে এবং নিজেদের হাত টেনে না রাখে, তাহলে তাদের (যুদ্ধক্ষেত্রে) যেখানেই পাও, ধরো এবং হত্যা করো। তাদের ওপর হাত উঠানোর জন্য আমি তোমাদের সুস্পষ্ট অধিকার দিলাম’ (সূরা নিসা, আয়াত ৯০-৯১)।
মুসলিম, মুনাফিক ও কাফিরের পার্থক্য বোঝাতে অর্থাৎ বিদ্বেষপ্রসূত ফতোয়াবাজির ব্যাপারে হানাফি মাজহাবের ইমাম আবু হানিফারও মত হচ্ছে ‘কোনো কথার যদি ৯৯ শতাংশই ইসলামবিরোধিতা বা অবিশ্বাসের বোঝায় এবং মাত্র ১ শতাংশ বিশ্বাস (ঈমান) অবশিষ্ট থাকে তাহলেও তাকে কাফির বলা যাবে না।’
ফতোয়াদানকারীর পরিণাম : আরবে ইসলাম আগমনের আগে তৌহিদপন্থী নগণ্য সংখ্যক হানিফ সম্প্রদায়সহ স্বয়ং রাসূল সা: ছাড়া একজনও মুসলিম ছিলেন না। তাই ইসলাম ও কুরআন নাজিল হয়েছিল সরাসরি কাফির ও মুশরিকদের উদ্দেশ্যেই, যাদের মধ্য থেকে সাহাবারা মুসলিম হিসেবে বেরিয়ে আসার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে মুনাফিকদের উদ্ভব হওয়ায় তাদের উদ্দেশ্যেও কুরআন নাজিল হয়েছিল। কিন্তু কথায় কথায় কিংবা পছন্দ না হলেই যাকে তাকে কাফির মুনাফিক বলার কুফরি প্রবণতা রোধে আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে
‘হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য বের হও, তখন বন্ধু ও শত্রুর মধ্যে পার্থক্য করো এবং যে ব্যক্তি সালামের মাধ্যমে তোমাদের দিকে এগিয়ে আসে, তাকে সাথে সাথেই বলে দিয়ো না যে, তুমি মুমিন নও’ (সূরা নিসা, আয়াত ৯৩)।
রাসূল সা:ও তার যুগে কিছু মুনাফিকের বিদ্বেষপ্রসূত ফতোয়াবাজির বিরোধিতা করেছেন এভাবে ইবনে উমার রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যদি কেউ তার মুসলিম ভাইকে ‘কাফির’ বলে, তখন তা তাদের উভয়ের মধ্যে একজনের ওপর বর্তায়। সে যা বলেছে, তা যদি সঠিক হয়, তাহলে তো ভালো, নচেৎ যে বলেছে তার ওপর সে কথা ফিরে যায় (অর্থাৎ সেই কাফির হয়ে যায়)। আবুজার গিফারি রা: থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছেÑ ‘কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে কাফির বা আল্লাহর দুশমন বলে অভিযুক্ত করল, অথচ এটি সত্য নয়, তাহলে ওই অভিযোগ তার ওপরই বর্তাবে।’
এমনকি রাসূল সা:-এর ২৩ বছরের নবুয়তি যুগে ঈমান আনার পরও মুসলিমদের জন্য আল্লাহ ইসলামের পরিপূর্ণ বিধান বা মৌলিক ইবাদতসমূহ নাজিলের প্রয়োজনবোধ না করায় সাহাবাদের সবাই মক্কায় একটানা ১৩ বছর পর্যন্ত সালাত, সাওম, হজ, জাকাত, পর্দা ইত্যাদি ছাড়া শুধু কালিমার চর্চাই করেছেন এবং মৃত্যুর পর একমাত্র শিরকমুক্ত ঈমানের ভিত্তিতেই জান্নাতি হয়েছেন। এমন জান্নাতি সাহাবাদের মধ্যে উম্মুল মোমিনিন হজরত খাদিজা রা: একজন, যিনি নবুয়তের দশম বছরে মৃত্যুবরণ করেন। আবার আল্লাহর বিধান অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের ধারাবাহিক নাজিলের কৌশলের কারণে একসাথে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ বা ফরজসমূহ নাজিল না হওয়ায় মক্কার অনেক জান্নাতি সাহাবিও অজ্ঞতাবশত অনিচ্ছাকৃত মুনাফেকি-কুফরিও করেছেন, অর্থাৎ তারা সুদ খেয়েছেন, মদ, জুয়া ইত্যাদিতেও জড়িত ছিলেন। এমনকি সালাত নাজিলের পরও মদ, জুয়া, সুদসহ অনেক হারামকার্য নিষিদ্ধ না হওয়ায় সাহাবিদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত থাকা অবস্থায় ইবাদত করেছেন, যা ইসলামের বৈজ্ঞানিক ও বিবেকসম্মত ফর্মুলা। কিন্তু এসব কাজ পরিত্যাগকারী অন্য সাহাবিরা তাদের কাউকেই এ জন্য গালমন্দ, বিদ্রƒপ কিংবা কাফির, মুনাফিক বলে ফতোয়া দেননি। মদিনার এক সাহাবি কাফিরদের বিরুদ্ধে রাসূল সা:-এর যুদ্ধপরিকল্পনার গোপন খবর ফাঁস করে মক্কায় পত্র পাঠিয়ে ধরা পড়লেও তিনি ‘মুনাফিক’ বা ‘কাফির’ ফতোয়া পাননি। মুসলিমদের ক্ষতি করার অসৎ নিয়ত তার ছিল না বলে রাসূল সা: তাকে শাস্তি দেননি। কেননা, পরকালে শুধু নিয়তের ওপর ভিত্তি করেই আল্লাহ মুসলিমদের জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন, আমলের ভিত্তিতে নয়। তাই রাসূল সা: বলেনÑ ‘ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াত’ অর্থাৎÑ কর্মের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যদি কারুর নিয়তের গড়বড় থাকে, তাহলে শত আমলের পরও তার ফলাফল হবে অভিশপ্ত কাফির, মুনাফিক ও শয়তানের মতো।