‘সাকরাতুল মাওত’ বা মৃত্যুযন্ত্রণা বলে কিছু আছে কি? থাকলে তার কষ্ট কেমন!
সাকরাতুল মাওত সত্য এবং প্রত্যেকেই তা মৃত্যুর সময় অনুভব করবে। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মরণ আক্রান্ত ব্যক্তির জ্ঞানহীন একটি অবস্থা হবে, সেটি কমবেশি রকমের কষ্টকর হবে এবং তার ছাপ মৃত ব্যক্তির চেহারায় ফুটে উঠবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। এ থেকেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে আসছ (সূরা কাফ : ১৯)।
হজরত আয়েশা রা: বর্ণিত- এরপর মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। এ সময় রাসূলুল্লাহ সা: স্ত্রী আয়েশার বুকে ও কাঁধে ঠেস দিয়ে বসা অবস্থায় ছিলেন। এমন সময় আয়েশা রা:-এর ভাই আব্দুর রহমান রা: সেখানে উপস্থিত হন। তার হাতে কাঁচা মিসওয়াক দেখে সে দিকে রাসূল সা:-এর দৃষ্টি গেল। আয়েশা রা: বলেন, আমি তাঁর (রাসূল সা:) আগ্রহ বুঝতে পেরে রাসূলের অনুমতি নিয়ে মিসওয়াকটি চিবিয়ে নরম করে তাঁকে (রাসূলকে) দিলাম। তখন তিনি সুন্দরভাবে মিসওয়াক করলেন ও পাশে রাখা পাত্রে হাত ডুবিয়ে (কুলিসহ) মুখ ধৌত করলেন। এ সময় তিনি বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। নিশ্চয়ই মৃত্যুর রয়েছে কঠিন যন্ত্রণাসমূহ (বুখারি ৪৪৪৯; মিশকাত ৫৯৫৯)।
এমন সময় তিনি ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে হাত কিংবা আঙুল উঁচিয়ে বলতে থাকলেন, ‘(হে আল্লাহ!) নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণ এবং নেককার ব্যক্তিগণ যাদের তুমি পুরস্কৃত করেছ, আমাকে তাদের সাথী করে নাও। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করো ও দয়া করো এবং আমাকে আমার সর্বোচ্চ বন্ধুর সাথে মিলিত করো। আল্লাহ! আমার সর্বোচ্চ বন্ধু!’ আয়েশা রা: বলেন, শেষের কথাটি তিনি তিন বার বলেন। অতঃপর তাঁর হাত এলিয়ে পড়ল, দৃষ্টি নিথর হয়ে গেল’। তিনি সর্বোচ্চ বন্ধুর সাথে মিলিত হলেন (বুখারি ৪৫৮৬, ৫৬৭৪; মিশকাত ৫৯৫৯-৬০)।
হাফিজ ইবনে হাজার রহ: বলেন, নেককার বদকার নির্বিশেষে মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যম্ভাবী। নেককারের জন্য শেষ সময়ে ক্ষমা প্রার্থনা সুযোগ হতে পারে, বদকারো হতে পারে, ক্ষমা চাইলে সময়ে তাকেও আল্লাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন।
অতঃপর যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি শাস্তি দেবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান (সূরা বাকারা: ২৮৪)।
খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বলেন, আমি চাই না মৃত্যুযন্ত্রণা আমার জন্য লাঘব হোক। কেননা সেটাই আমার জন্য শেষ সুযোগ। ক্ষমা নসিব হলে গুনাহমুক্ত ব্যক্তির স্পর্শ পেয়ে ফেরেশতারা খুশি হবেন, কবর পর্যন্ত সঙ্গ দেবেন।
সব ইমাম এ বিষয়ে একমত যে একমাত্র শহীদদের মৃত্যু কষ্টবিহীন হবে। মনে হবে তার শরীরে একটা পিঁপড়া কামড় বসিয়েছে মাত্র। বাকিদের ব্যাপারে মৃত্যুযন্ত্রণা হবেই সেটা অল্প বা বিস্তর।
ইবনে হাজম আন্দালুসী তার ‘মৃত্যু যন্ত্রণাময়’ শীর্ষক এক নিবন্ধে বলেন, কোনো মৃত্যুপথযাত্রীকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে সেটা আসলেই কষ্টকর। কারণ এর কোনো আলামত দৃশ্যমান হয় না। তিনি বলেন, সাকরাতুল মাওত শারীরিক নয়, আত্মিক। কুরআনে ‘তুমি যদি দেখতে’ এমন আয়াতে এ কথার সমর্থন মিলে।
যদি তুমি দেখতে যখন জালেমরা মৃত্যুযন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর স্বীয় আত্মা! আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতসমূহ থেকে অহঙ্কার করতে (সূরা আনআম : ৯৩)।
পক্ষান্তরে ঈমান আনার পর যারা দ্বীনের পথে অবিচল থাকে তাদেরকে মৃত্যুর ফেরেশতা এ সময় অভয় দেয় এবং জান্নাতের সুসংবাদ শোনায়- নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোনো (সূরা ফুসসিলাত : ৩০)।
হে আল্লাহ ! আমাদের মৃত্যুকে সহজ ও প্রশান্তময় করে দিন, মৃত্যুকালীন আজাব থেকে রক্ষা করুন, ঈমান ও ইসলামের উপর মৃত্যু দিন এবং মৃত্যুকালে ক্ষমা নসিব করুন। আমীন।
লেখক : সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি: