শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩৩ অপরাহ্ন

যুগে যুগে কোরবানি ও ইসলামের সাম্যের বিধান

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২০
  • ৫৮ জন নিউজটি পড়েছেন

অকারণে জীব হত্যা ইসলামে অন্যায়। ভালোবাসা দিয়ে প্রাণীর লালন-পালনের শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। প্রাণীর প্রতি কোনো নির্যাতন করা চলবে না।

জগতের সব জীবের প্রতি প্রীতি প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়ে করুণার ছবি মোহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, জগতের সব প্রাণীর প্রতি তোমরা করুণা প্রদর্শন কর আকাশের মালিক তোমাদের প্রতি করুণা করবেন।( তিরমিযী, সুনান ১৯৩০)

সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ মানুষের প্রয়োজনের অধীন করেছেন সৃষ্টির সবকিছু। বলেছেন, তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। (বাকারা-২৯)

মানুষ প্রয়োজনে বিশ্ব জগতের সবকিছু ব্যবহার করবে। কারণ মানুষের জন্য বিশ্ব জগৎ আর মানুষ পালনকর্তার জন্য। স্রষ্টার বিধান মেনে মানুষ তার প্রয়োজন মেটাবে, এটিই নিয়ম।

‘জীব হত্যা মহাপাপ’ এ সব সস্তা বুলি। বিশ্ব সমাজের ভারসাম্য রক্ষায় তা অচল। বৈরাগ্যবাদ লোকালয়ে চলে না। বন-জঙ্গলের সীমানায় ও এইরূপ মতবাদ অচল। নিরামিষ ভোজী! সে তো তরকারি শাক-সবজির সমাহার। এগুলো প্রাণহীন? না, এগুলোরও প্রাণ আছে।

তারাও আল্লাহর নাম জপ করে। তাতো সৃষ্টি কর্তার কথা। প্রাণ না থাকলে জপ করে কিভাবে। আধুনিক বিজ্ঞান বিষয়টি খোলাসা করে দিয়েছে। বলছে, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে।

রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা- হিংস্রজাত পশু ছাড়া তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জীবকে হালাল করা হয়েছে।(মায়িদা-১) সৃষ্টি যার তিনিই যেখানে বৈধ করেছেন সেখানে অতি সন্ন্যাসী সাজার কি আছে।

জবাই হবে আল্লাহর নামে

পশু জবাই করতে হবে সৃষ্টি কর্তা আল্লাহর নামে। প্রাণীর প্রতি আমার যথেষ্ট প্রেম আছে। আছে ভালোবাসাও। আমার যেমন প্রাণ তারও সেরকম প্রাণ। প্রাণ আমার হোক আর পশু-পাখির হোক, আল্লাহর নামের কাছে তা কিছুই নয়।

কারণ আমাদের জীবন মরণ আল্লাহর জন্য। ইসলাম ফিতরাতের ধর্ম। মানুষের নাড়ি বুঝে এর বিধান দেয়া হয়েছে। এতে নেই কোনো প্রাণী পূজা আর নেই কোনো প্রাণীর সাজা।

আমার মালিক আর প্রাণীর মালিক একজনই। এক কথায় বিশ্ব জাহানের অধিপতি হলেন আল্লাহ্। আমার জন্য তার গোশত হালাল করেছেন তিনিই। আমরা তাঁরই হুকুমের অধীন। তাঁর নামেই প্রাণীকে আমরা হালাল করি।

বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার হল হালদারের মন্ত্র। এর উপরে আর কোনো করুণা দেখানো হবে ভণ্ডামি। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশির মতো।

আদম পুত্রদের কোরবানি

যুগে যুগে আল্লাহর নামে প্রাণী উৎসর্গ করার প্রচলন ছিল। আমরা যাকে কোরবানি বলি। আদি মানব আদম (আ .)-এর দুই পুত্র কোরবানি করেছিলেন।

ইরশাদ হয়েছে, আদম দু’পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল।(৫:২৭)

ইবরাহীম (আ .)-এর কোরবানি

ইবরাহীম (আ.)-এর কোরবানি ছিল মহা এক পরীক্ষা। আল্লাহর পক্ষ হতে পুত্রকে কোরবানি করার আদিষ্ট হন তিনি। রবের পক্ষ হতে আদেশপ্রাপ্তির পর আল্লাহর নামে উৎসর্গ করতে আর হতে সামান্যতম ও কুণ্ঠাবোধ করেননি পিতা ও পুত্র। মূর্তিমান সহনশীল এই পুত্র ছিলেন ইসমাঈল (আ.)। তখন তিনি ছিলেন পিতার একমাত্র সন্তান।

সেই পরীক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটে একটি দুম্বা কোরবানির মাধ্যমে। মুহাম্মাদ (সা.)তাঁর উর্ধ্বতন পুরুষ ইবরাহীম (আ.)-এর অনুকরণে সেই কোরবানির বিধান চালু রাখেন।

সাহাবায়ে কিরামের প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)বলেছিলেন,এটি তোমাদের পূর্ব পুরুষ ইবরাহীম প্রবর্তিত রীতি।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোরবানি

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছাগল, ভেড়া ও গরু কোরবানি করেছেন। কোনো সময় নিজেই নিজের কোরবানি করেছেন। কোনো সময় সহধর্মিণীগণের পক্ষে এবং কোনো সময় উম্মাহর পক্ষ থেকে ছিল তাঁর কোরবানি।

প্রাণীকুলের প্রতি ছিল তাঁর অকুণ্ঠ ভালোবাসা। তবে আল্লাহর ভালোবাসার কাছে দুনিয়ার সব ভালোবাসা তাঁর কাছে ছিল পরাজিত। তাই নিজ হাতে তিনি পশু কোরবানি করেছেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি ঈদগাহে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। খুৎবা শেষে তিনি মিম্বার থেকে অবতরণ করলে তাঁর কাছে একটি ভেড়া নিয়ে আসা হল । তিনি তা নিজ হাতেই জবাই করলেন।(সুনানে তিরমিযী ১৫২১)

যারা গরুর অতিমাত্রায় ভক্ত তারা বলতে চান ইসলামের নবী গরুর গোশত খাননি। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) গরু জবাই করেছেন এমনকি গরুর কোরবানি ও দিয়েছেন।

উম্মত জননী আয়েশা (রা.) বলেন, আমরা মিনায় অবস্থানকালে আমাদের কাছে গরুর গোশত নিয়ে আসা হল। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটি কি। লোকজন বলল, রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি গরু তার সহধর্মিণীগণের পক্ষে কোরবানি দিয়েছেন। এটি ছিল বিদায় হজের ঘটনা। এরপর তিনি আর কোরবানি করার সুযোগ পাননি। (সহীহ বুখারী-৫২২৮)

আমরা পরিবেশবাদী হই আর পশু-পাখি প্রেমিক হই কিংবা গো পূজারী হই সবাইকে মনে রাখতে হবে আমরা মহান আল্লাহর গোলাম। গোলামের কাজ মনিবের দাসত্ব করা। যিনি বিশ্বজগতের মালিক তিনি যেনতেন মনিব নন।

তিনি খাদ্য ও আলো-বাতাস দিয়ে গোটা জগৎ পালন করেন। তার আদেশের সামনে মাথানত করার মাঝে রয়েছে গোটা জগতের কল্যাণ। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তোমার রবের জন্য সালাত আদায় কর
এবং কোরবানি কর। (সূরা কাওসার)

নিবেদিত মনে কোরবানি

আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশিত,ইবরাহীম (আ.) প্রদর্শিত ও মুহাম্মাদ (সা.) সমর্থিত কোরবানি একান্ত নিবেদিত মনে হতে হবে। এতে কোরবানি নামের ত্যাগ আমাদের জীবনে স্বার্থকতা নিয়ে আসবে।

কোরবানি প্রদর্শনীর মহড়া নয়। নয় মুখ রক্ষার কোনো অনুষ্ঠান। ভুরি ভোজের কোনো আয়োজনও নয়। দেহ, মন ও অর্থকে সম্পূর্ণ রূপে পালনকর্তা আল্লাহর নামে বিসর্জন দেয়ার নাম কোরবানি। এমনটি হলে পশুর লোমে লোমে অর্জিত হবে পুণ্য।

আল্লাহ তার গোলামের মনের ভাব দেখতে চান। তার কাছে পশুর কোনো গোশত ও শোণিতের কোনো মূল্য নেই। বান্দা কি মনে ও কোন্ ইয়াকীন নিয়ে কোরবানি করছে সেটি মূল্যায়ন করেন আল্লাহ্।

রাসূলুল্লাহ (সা.) কোরবানি করার সময় বলতেন ইন্নী ওয়াজ্জাহতু… আমি আমাকে মহাবিশ্বের সৃষ্টি কর্তার সামনে সোপর্দ করলাম। শেষে বলতেন, ওহে আল্লাহ্! ইবরাহীম খলিল হতে যেভাবে কবুল করেছ সেরকম আমাদের থেকে কবুল কর।

আল্লাহর মহব্বতে বিলীন হয়ে ইবরাহীম (আ.)-এর ঘোষণা ছিল-আমার সালাত,আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ মহাবিশ্বের পালন কর্তার জন্য নিবেদিত। (আনআম-১৬২)

ইবরাহীমী প্রেরণায় মুহাম্মদী চেতনায় আল্লাহ্ আমাদের কোরবানি করার তাওফীক দাও।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English