রোববার ছিল বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিনটি পালনে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল- ‘সংকটকালে শিক্ষকদের নেতৃত্ব দিতে হবে এবং নতুন করে ভাবতে হবে’। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক সমাজকে দেশ ও জাতির উন্নয়নে নেতৃত্ব দেয়া কতটা বাস্তবসম্মত সে বিষয়ে আলোকপাত করছি।
বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও উপযুক্ত মর্যাদা এবং সম্মানজনক বেতন স্কেল থেকে বঞ্চিত। ক্ষুধার রাজ্যে বসবাস করে অভাবের মাঝে বিচরণ করে নেতৃত্ব দেয়া এবং দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবা অনেকটাই স্বপ্নের মতো।
ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের ঊষালগ্নে গ্রামের তৃণমূলের মানুষ পারিবারিক যে কোনো জটিল সমস্যার সমাধানে শিক্ষকদের কাছে ছুটে আসত, তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করত। জিয়াউর রহমান সরকারের আমল ১৯৮০ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে গ্রাম সরকারের হাতে ন্যস্ত করার আইন করায় জনগণের মাঝে শিক্ষক নেতৃত্ব বিপন্ন হয়। রাষ্ট্রপতি এরশাদ আমলে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, বরখাস্তসহ সবকিছু উপজেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করা হয়।
বর্তমানে প্রাথমিকে নেতৃত্ব দেয়ার মানসিকতা থেকে শিক্ষকদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষকরা জি-হুজুর বলতে অভ্যস্ত। আর সংশ্লিষ্টরা তা শুনে পুলকিত বোধ করে। সমস্যার যৌক্তিক সমাধান না করে কৌশলে তা জটিল করে ফেলাই যেন প্রাথমিক শিক্ষার সংশ্লিষ্টদের কাজ।
শিক্ষকরা নিয়োগ পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এখানে বিএ, এমএ, অনার্স ডিগ্রি দেখা সমীচীন নয়। মনে রাখতে হবে, বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর পায় না। প্রাথমিকে শিক্ষক পদে যোগ্য শিক্ষক আসুক, এ প্রত্যাশা সবার মতো আমারও। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও সিনিয়র সচিব একাধিকবার বলেছেন, প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতি হবে। অথচ পুরনো নিয়োগবিধি মোতাবেক ৬৫ ভাগ শিক্ষক পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন।
সারা দেশে বিপুলসংখ্যক সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগ করা হয়। তাদের বেশিরভাগই ২/১ বছরের মধ্যে অবসরে চলে যাবেন। শিক্ষকতার যোগ্যতা পুরনো নিয়োগবিধি মোতাবেক থাকলেও অভিজ্ঞতার যোগ্যতার ঝুড়ি অনেক ভারি। শেষ বয়সে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্বে ৩/৪ বছর কাজ করার পর পদোন্নতি না দেয়া তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মতো হবে। অভিজ্ঞতাকে যোগ্যতার মাপকাঠি দিয়ে ভাবতে হবে। বিধি মোতাবেক টাইমস্কেল, সিলেকশান গ্রেড প্রাপ্তি কারও দয়া নয়।
প্রাথমিকে এ প্রাপ্তির বিড়ম্বনার কথা ভেবে কষ্ট হয়। জাতীয়করণকৃত শিক্ষকরা বিধিবহির্ভূতভাবে টাইমস্কেল, সিনিয়রিটি জোর করে নেননি। একশ্রেণির শিক্ষক নেতা দালালি, চাঁদাবাজি করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা অনৈতিকভাবে তাদের এ সুবিধা দিয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বাস্তব স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকা দরকার। ছোট শিশুর ওপর বইয়ের বোঝা, প্রাথমিক শিক্ষার কর্মঘণ্টার বৈষম্য- বাজেটের সঙ্গে এ দুটি বিষয় যুক্ত নয়- তবুও তা দূর করতে বছরের পর বছর পার করে সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে প্রস্থান করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষাবান্ধব সরকার শিক্ষার উন্নয়নে বিশাল কর্মযজ্ঞ করে যাচ্ছে। কিন্তু জটিলতা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের জন্য এ ক্ষেত্রে সফলতাগুলো ম্লান হচ্ছে। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, মন্ত্রণালয় তো ঢাকা শহরেই অবস্থিত।
কিন্তু তাদের কাজকর্মের ধীরগতি দেখে মনে হয় সংশ্লিষ্টরা অতীতের মানসিকতার মধ্যে আটকে আছে এখনও। করোনার মাঝে বিশ্ব শিক্ষক দিবস যথাযথভাবে পালিত না হলেও দিবসটিকে একবারে মুছে ফেলার সুযোগ নেই। শিক্ষা তথা শিক্ষকদের প্রতি সবার ভালোবাসা জাগ্রত হোক। শিক্ষকদের সব দুঃখ-কষ্ট দূর হোক। শিক্ষকরা নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা অর্জন করুক, এটাই প্রত্যাশা।