পৃথিবীর সব জালিমের বিরুদ্ধে শুধু ঈমানি শক্তির দীপ্ততায় একজন ঈমানদারের সাহসিকতার সাথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকা মুসলমানদের অন্যতম একটি গুণ। ইসলামের সোনালি যুগের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, মুসলমানরা সংখ্যায় অপ্রতুল ছিল কিন্তু তখনো মুসলমানদের দীপ্ততায় তখনকার যুগের পরাশক্তি বিশেষ করে যে দুটি সাম্রাজ্য তাদের শৌর্যবীর্যে পৃথিবীর ওপর আধিপত্য কায়েম করেছিল সেই রোম ও পারস্যের মসনদ কাঁপত। অনেক বেশি সংখ্যক কাফেরের বিরুদ্ধে যদি একজন মুসলমানকেও দাঁড়াতে হতো তাহলে সে ঈমানি শক্তির বলে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে যেত।
মুসলমানরা কখনো সংখ্যাধিক্যের ওপর নির্ভর করে না বরং তারা তাদের ঈমানি ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার কারণে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পিছপা হয় না। বর্তমানে মুসলমানদের রয়েছে বিশাল জনশক্তি, পারমাণবিক অস্ত্র ও বিশাল সামরিক বাহিনী এবং বিলিয়ন বিলিয়ন সম্পদ, স্বর্ণের খনি, তেলের খনি কিন্তু এত কিছুর পরও কেন তারা লাঞ্ছিত হচ্ছে? এর তিনটি কারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যÑ ১. দুনিয়ার মোহাব্বত; ২. মৃত্যুর ভয়; ৩. কুরআন-সুন্নাহ থেকে দূরে থাকা।
বর্তমানে বেশির ভাগ মুসলিম দুনিয়ার মোহে এত আচ্ছন্ন যে সর্বদায় দুনিয়াবি খ্যাতি অর্জনে ব্যস্ত থাকে। আর মৃত্যুর ভয়ে এতটাই ভীত যে, কাফের-মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়তে সাহস পায় না। সর্বোপরি কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা বাস্তব জীবনে আমলে পরিণত না করাও মুসলমানদের লাঞ্ছনার একটি বড় কারণ।
সূরা হুজুরাতের ১০ নম্বর আয়াতে রয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই’। এটি সুপরিচিত একটি আয়াত, বেশির ভাগ মুসলিম ওই আয়াতটি সম্পর্কে জ্ঞাত। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ এর বাস্তব প্রতিফলন আজ কতটুকু দেখা যায়?
বর্তমানে মুসলিম সম্প্রদায় নানান দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, অন্যের প্রতি বিষাক্ত মন্তব্যেই কিছু মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছে, বাংলাদেশেও এই বিভক্তির ছড়াছড়ি লক্ষণীয়। এ সুযোগে অন্যরা বিভিন্নভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘মুমিনরা একটি দেহের মতো, দেহের যে অঙ্গেই ব্যথা হোক না কেন তাতে সম্পূর্ণ দেহ ব্যথা অনুভব করে জ্বর ও অনিদ্রায় ভুগতে থাকে।’ (বুখারি-৬০১১, মুসলিম-২৫৬৮)
আমাদের প্রতিটা দিনের সময়গুলো কি মাজলুমের আর্তনাদে একটুখানিও প্রভাবিত হচ্ছে?
ইন্টারনেটের কল্যাণে প্রতিনিয়ত আমরা সারা বিশ্বের মুসলমানদের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারছি কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের ব্যাপার হলো, এ বিধ্বংসী অবস্থার জন্য আমাদের হৃদয়ে বিক্ষোভ সৃষ্টি হয় না!
আঁধারে আলো : রাতের আকাশে তারকার উপস্থিতির মতোই আধুনিক জাহেলিয়াতের এ সময়েও রয়েছে কিছু নুরানিয়াত হৃদয়, যে হৃদয়গুলোতে ব্যথা জাগে মুসলিম বিশ্বের এমন লাঞ্ছনাকর অবস্থার কারণে এবং উম্মাহর অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চিন্তা-গবেষণায় প্রার্থনারত হয়ে রাতের শেষ প্রহর কাটে। দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে মুসলমানরা সৎ আমল করতে অবহেলা না করলে আল্লাহ তাদেরকে খিলাফত দান এবং বিধর্মীদের অত্যাচার থেকে নিরাপত্তা দানের ওয়াদা করেছেন। সূরা মুহাম্মদের ৭ নাম্বার আয়াতে রয়েছে, ‘আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন যে আল্লাহকে সাহায্য করবে’। সূরা ফাতহের ২৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেÑ ‘আল্লøাহ তায়ালা রাসূল সা:কে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে পাঠিয়েছিলেন; আল্লøাহ জাল্লাজালালুহু সে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে নবী সা:কে সাহায্য করেছেন’। আমাদেরও উচিত দ্বীন শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রাম অব্যাহত রাখা।
নতুন এক বিশ্ব রচনা করা সম্ভব যদি আমরা অদৃশ্যের এ শিকল ভাঙতে পারি; নয়তো কিয়ামতের মাঠে পাকিস্তানের সম্মানিত বোন আফিয়া সিদ্দিকী ও সিরিয়ার আইলান কুর্দি এবং কাশ্মিরের ছোট্ট শিশু হিবার মতো হাজারো নারী শিশুর গগনবিদারী আর্তচিৎকার আর মৃত্যুর কারণে সামান্য হলেও দণ্ডিত হবো আমরা। ষড়যন্ত্রকারীরা যতই অপছন্দ করুক না কেন; যতই আল্লøাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চেষ্টা অব্যাহত রাখুক না কেন, তা পুরো শানশওকতের সাথে পুরো পৃথিবীতে অবশ্যই বিস্তার লাভ করবে।
বৈশ্বিক সহিংসতা থেকে উত্তরণ : মুসলিম দুনিয়ার ঐতিহাসিক এ সমস্যাগুলো নেতাদের সেভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না, যদিও প্রত্যেক মুসলিমের ওপরই শান্তি সংগ্রামের ভার নির্ভর করে। কিন্তু দায়িত্ববানদের উচিত সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনার অন্যতম উপায় খুঁজে বের করা। শান্তির বার্তাবাহক মহানবী সা: বলেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন মুসলমানরা সংখ্যায় বেশি হবে, তদুপরি তারা কাফের-মুশরিক, নাস্তিক-মুরতাদ তথা বিধর্মী পরাশক্তির ফেলা জালে আবদ্ধ হয়ে নানা বিপদের সম্মুখীন হবে; ইসলামের সোনালি যুগের ইতিহাস আন্তর্জাতিকভাবে ফিরিয়ে আনতে রাসূল সা:-এর সিরাতগ্রন্থ সর্বসাধারণের পাঠ্য হতে হবে এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবনালেখ্য পড়ে তা সরাসরি বিচারব্যবস্থা, সংসদ ভবন থেকে শুরু করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর আমাদের নিজেদের মধ্যে একে অপরের বিরুদ্ধাচরণ বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর জন্য সবাইকে ভালোবাসতে হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, ইমাম মাহদি আ: আগমনের সময় অতি নিকটে; আমাদের চিন্তার সময় এসেছে নিজেদের পবিত্র করে মহান নেতা ইমাম মাহদি আ:-এর সহযোগী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা। আল্লøাহ রাব্বুল ইজ্জত আমাদের তাঁর পথে কবুল করুন, আমীন।