আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টি করে এমনিতেই ছেড়ে দেননি। কোন কোন কাজ করলে মানুষ সফলতা লাভ করবে আর কোন কোন কাজ করলে মানুষের অকল্যাণ হবে তা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আসরে সময়ের কসম করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে তবে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আর পরস্পরকে হকের উপদেশ দিয়ে থাকে আর ধৈর্য ধারণে উদ্বুদ্ধ করে থাকে।’ (সূরা আসর : ১-৩)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, প্রথম আয়াতে মানবজাতি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ততার মধ্যে রয়েছে সতর্ক করে মহান আল্লাহ তা থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এ ক্ষতির কবল থেকে কেবল তারাই মুক্ত, যারা চারটি বিষয় নিষ্ঠার সাথে পালন করেÑ ঈমান, সৎকর্ম, অপরকে সত্যের উপদেশ এবং সবরের উপদেশ দান করে থাকে। দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং মহা উপকার লাভ করার চার বিষয় আল্লাহ নিজেই তার বান্দার জন্য ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন।
সূরায় বর্ণিত প্রথম দুটি বিষয় আত্মসংশোধন সম্পর্কিত, অপর দুটি বিষয় মুসলিমদের হেদায়েত সম্পর্কিত। এই সূরার দৃষ্টিতে যে চারটি গুণাবলির উপস্থিতিতে মানুষ ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকতে পারে তন্মধ্যেÑ
প্রথম গুণ ঈমান। ঈমান শব্দের অর্থ স্বীকৃতি ও বিশ্বাস স্থাপন করা। শরিয়তের পরিভাষায় অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকার এবং কাজকর্মে তার বাস্তবায়ন। (মাজমু ‘ফাতাওয়া ৭/৬৩৮) এখানে ঈমান আনা বলতে প্রথমত আল্লাহকে মানা। নিছক তাঁর অস্তিত্ব মেনে নেয়া নয়। বরং তাকে এমনভাবে মানা যাতে বোঝা যায় যে, তিনি একমাত্র প্রভু ও ইলাহ। তাঁর সর্বময় কর্তৃত্বে কোনো অংশীদার নেই। একমাত্র তিনিই মানুষের ইবাদত, বন্দেগি ও আনুগত্য লাভের অধিকারী। তিনিই ভাগ্য গড়েন ও ভাঙেন। বান্দার একমাত্র তারই কাছে প্রার্থনা এবং তারই ওপর নির্ভর করা উচিত। তিনিই হুকুম দেন ও তিনিই নিষেধ করেন। তিনি যে কাজের হুকুম দেন তা করা ও যে কাজ থেকে বিরত রাখতে চান তা না করা বান্দার ওপর ফরজ। দ্বিতীয়ত, রাসূলকে মানা। তাঁকে আল্লাহর নিযুক্ত পথপ্রদর্শক ও নেতৃত্বদানকারী হিসেবে মানা। তিনি যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে দিয়েছেন, তা সবই সত্য এবং অবশ্যই গ্রহণযোগ্য বলে মেনে স্বীকৃতি দেয়া। আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অনেক রাসূল ও নবী পাঠিয়েছেন। কিন্তু মুহাম্মদ সা: সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তৃতীয়ত, ফেরেশতাদের ওপর ঈমান। চতুর্থত, আল্লাহর কিতাবসমূহের ওপর ঈমান আনা ও কুরআনের নির্দেশ বাস্তবায়নে সদা সচেষ্ট থাকা। পঞ্চমত, আখিরাতে বিশ্বাস করা। মানুষের এই জীবনটিই শেষ নয়, বরং মৃত্যুর পর মানুষকে পুনরায় জীবিত হয়ে উঠতে হবে। ষষ্ঠত, তাকদিরের ভালো বা মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত থাকার বিষয়টি মেনে নেয়া। মূলত ঈমানের এই ছয়টি অঙ্গ যেকোনো লোকের নৈতিক চরিত্র ও তার জীবনের সমগ্র কর্মকাণ্ডের জন্য অতীব জরুরি। যেখানে ঈমানের অস্তিত্ব নেই সেখানে মানুষের জীবন যতই সৌন্দর্য বিভূষিত হোক না কেন আল্লাহ তায়ালার কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। (বিস্তারিত ড. আবদুল আয়িজ, আল-কারি; তাফসির সূরাতিল আসর)।
দ্বিতীয় গুণ সেটি হচ্ছে সৎকাজ। কুরআনের পরিভাষায় একে বলা হয় আমালে সালেহা। সমস্ত সৎকাজ এর অন্তর্ভুুক্ত। কোনো ধরনের সৎকাজ ও সৎবৃত্তি এর বাইরে থাকে না। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে যে কাজের মূলে ঈমান নেই এবং যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত হেদায়াতের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয়নি তা কখনো সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।
তৃতীয় গুণ হকের দাওয়াত। তাফসিরবিদগণ হকের বিভিন্ন অর্থ করেছেন। ইবন আব্বাসের মতে, ঈমান ও তাওহিদ ( কুরতুবী) কাতাদা বলেন, কুরআন। আল্লামা সুদ্দী বলেন, এখানে হক্ক বলে আল্লাহ্কেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে।
কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে, এখানে হক বলে “শরিয়ত নির্দেশিত কাজগুলো করা এবং শরিয়ত নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিত্যাগ করা বোঝানো হয়েছে (ইবন কাসীর)।
তবে হক এমন কাজকে বুঝানো হয়েছে যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আর তা যাবতীয় কল্যাণমূলক কাজ। সেটি তাওহিদ, শরিয়তের আনুগত্য, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ, দুনিয়াবিমুখ ও আখিরাতমুখী হওয়া সবই বোঝায়। (তাফসিরে কাশশাফ)।
বস্তুত হকের আদেশের প্রতি অসিয়ত করার বিষয়টি ওয়াজিব হক ও নফল হক উভয়টিকেই শামিল করে। তাই সার্বিকভাবে আয়াতের অর্থ হচ্ছে: সঠিক, নির্ভুল, সত্য, ন্যায় ও ইনসাফ অনুসারী এবং আকিদা ও ঈমান বা পার্থিব বিষয়াদির সাথে সম্পর্কিত প্রকৃত সত্য অনুসারী কথা বলতে হবে।
সুতরাং এ সূরায় মুসলিমদের প্রতি একটি বড় নির্দেশ এই যে, নিজেদের দ্বীনকে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী করে নেয়া যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি, ততটুকুই জরুরি অন্য মুসলিমদেরকেও ঈমান ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান করার সাধ্যমতো চেষ্টা করা। এ কারণেই কুরআন ও হাদিসে প্রত্যেক মুসলিমের প্রতি সাধ্যমতো সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ফরজ দায়িত্ব ও কর্তব্য গণ্য করা হয়েছে (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)। যারা এ আমল করবে তাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত তথা সর্বোত্তম উম্মত বলা হয়েছে, যারা এই দায়িত্ব পালন করে (সূরা আলে ইমরান ১১০)।
চতুর্থ গুণ ‘সবর’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ নিজেকে বাধা দেয়া ও অনুবর্তী করা। তাফসিরকারকগণ সবরের কয়েকটি অর্থ করেছেন। এক. যাবতীয় গোনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকা। দুই. সৎ কাজ করা এবং এর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। তিন. বিপদাপদে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা (মাদারেজুস সালেকিন ২/১৫৬)।
সুতরাং সৎকর্ম সম্পাদন, গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা এবং এতদসংক্রান্ত বিপদাপদ মোকাবেলা করা সবই ‘সবর’ এর শামিল। সুতরাং আয়াতের অর্থ হচ্ছে, হকের নসিহত করার সাথে সাথে দ্বিতীয় যে জিনিসটি ঈমানদারগণকে ও তাদের সমাজকে ক্ষতি থেকে বাঁচাবে তা হচ্ছে এই সমাজের ব্যক্তিবর্গ পরস্পরকে সবর করার উপদেশ দিতে থাকবে। হককে সমর্থন করতে ও তার অনুসারী হতে গিয়ে যেসব সমস্যা ও বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় এবং এ পথে যেসব কষ্ট, পরিশ্রম, বিপদ-আপদ, ক্ষতি ও বঞ্চনা মানুষকে নিরন্তর পীড়িত করে তার মোকাবেলায় তারা পরস্পর অবিচল ও দৃঢ়পদ থাকার উপদেশ দিতে থাকবে। ক্ষতি হতে সেই ব্যক্তিরা নিরাপত্তা লাভ করবে, যারা ঈমান এনে নেক আমল করবে। কেননা, তার পার্থিব জীবন যেমনভাবেই অতিবাহিত হোক না কেন, মৃত্যুর পর সে চিরস্থায়ী নিয়ামত এবং জান্নাতের চিরসুখ লাভ করে ধন্য হবে।
পরবর্তীতে মুমিনদের আরো কিছু গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। তারা একে অপরকে শরিয়তের আনুগত্য করার এবং নিষিদ্ধ বস্তু এবং পাপাচার হতে দূরে থাকার উপদেশ দেয়। মসিবত ও দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য, শরিয়তের হুকুম-আহকাম ও ফরজসমূহ পালন করতে ধৈর্য, পাপাচার বর্জন করতে ধৈর্য, কামনা-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়ে থাকে। অতএব আমাদের সবার উচিত আল্লাহর দেয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী নিজে আমল করা ও অন্যকে আমলের জন্য উদ্বুদ্ধ করা। আল্লাহ আমাদেরকে সুস্পষ্ট ক্ষতি থেকে মুক্তি পাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।