শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৩ অপরাহ্ন

সৌভাগ্যের রজনী পবিত্র শবেবরাত

অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ২৬ মার্চ, ২০২১
  • ৫৮ জন নিউজটি পড়েছেন
অভাবে ধৈর্য ও তাড়া থেকে মুক্তির আমল

পবিত্র শাবান মাসের ফজিলতপূর্ণ রাত—‘লাইলাতুল বারাআত’। লাইলাতুল বারাআত আরবি শব্দ, ফারসিতে বলা হয়—‘শবেবরাত’। ‘শব’ অর্থ রাত, ‘বরাত’ অর্থ ভাগ্য, সেই হিসেবে ‘শবেবরাতের’ আভিধানিক অর্থ ভাগ্যরজনি। পবিত্র কুরআনে এ রাতকে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ্’—বরকতময় রজনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিস শরিফে রসুল (স) এ মহিমান্বিত রাতকে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান’—শাবান মাসের মধ্যরজনি বলে উল্লেখ করেছেন। হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহ ও তাফসিরের কিতাবে এ রাতের আরো কিছু নাম উল্লেখ হয়েছে।

যেমন—‘লাইলাতুল কিসমাহ্’—ভাগ্যের রাত, ‘লাইলাতুত তাজবিয’—রিজিক বণ্টনের রাত, ‘লাইলাতুল ফায়সালাহ্’—তকদির নির্ধারণের রাত, ‘লাইলাতুল আফউ’—ক্ষমার রাত, ‘লাইলাতুল কারামি’—দয়ার রাত, ‘লাইলাতুত তাওবাহ্’—তাওবার রাত ও ‘লাইলাতুন নাদামাহ্’—মিনতির রাত ইত্যাদি।

আরবি মাসে রাত আগে আসার কারণে ১৪ শাবান দিবাগত রাতেই পালিত হবে শবেবরাত। শাবান মাস আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাপূর্ণ মাস। এ মাসকে রমজানের প্রস্তুতি মাস বলা হয়েছে। নবি করিম (স) অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে বেশি নফল রোজা পালন করতেন। শবেবরাতের ফজিলত সম্পর্কে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে কোনো এক রাতে রাত্রিযাপন করছিলাম। এক সময় আমি তাকে বিছানায় না পেয়ে মনে করলাম—তিনি হয়তো অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে গিয়েছেন। আমি তাকে খুঁজতে বের হলাম। গিয়ে দেখি—তিনি জান্নাতুল বাকিতে কবরবাসীদের পশে দাঁড়িয়ে অঝোর নয়নে কাঁদছেন। নবিজি আমাকে উদ্দেশ করে বললেন—‘হে আয়েশা! তুমি কি মনে করো, আল্লাহর রসুল তোমার ওপর বেইনসাফি করেছেন?’ আমি বললাম—ইয়া রসুলাল্লাহ! আপনাকে বিছানায় না পেয়ে ধারণা করেছিলাম—আপনি হয়তো অন্য কোনো স্ত্রীর ঘরে গিয়েছেন। এরপর রসুল (স) বললেন, হে আয়েশা! আজকের রাত সম্পর্কে তুমি জেনে রেখ, মহান আল্লাহ এই রাতে দুনিয়ার প্রথম আকাশে অবতীর্ণ হয়ে দুনিয়াবাসীর ওপর তাঁর খাস রহমত নাজিল করেন। কাল্ব গোত্রের মেষের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়েও অধিকসংখ্যক বান্দাকে তিনি ক্ষমা করেন। (সুনানে তিরমিযি—১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৬)

ইবনে মাজাহ্ শরিফের হজরত আলী (রা) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলাল্লাহ (স) বলেছেন—‘যখন শাবানের মধ্যরজনি আসবে তখন তোমরা সে রাতে কিয়াম তথা নামাজ পড়বে, রাত জেগে ইবাদত করবে এবং পরদিন রোজা রাখবে। কেননা সে দিন সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে এসে বান্দাকে এই বলে ডাকতে থাকেন—আছ কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী, যাকে আমি ক্ষমা করব। আছ কি কেউ রিজিক প্রার্থনাকারী, যাকে আমি রিজিক দিব। আছ কি কেউ বিপদগ্রস্ত, যাকে আমি বিপদ থেকে উদ্ধার করব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ ঘোষণা দিতে থাকেন।’ (হাদিস নম্বর ১৩৮৪)

আল্লাহ এ পুণ্যময় রজনিতে অসংখ্য বান্দা-বান্দিকে ক্ষমা করেন, তবে দুই শ্রেণির লোকের জন্য তাঁর ক্ষমার দ্বার বন্ধ থাকে। (এক) ‘মুশরিক’—যে তাঁর সঙ্গে অন্যকে উপাস্য বানিয়েছে; (দুই) বিদ্বেষপোষণকারী, যে তার অন্য মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯২)

আল্লাহ্র কাছে পাঁচটি রাত খুবই মর্যাদার। এর মধ্যে শবেবরাতের রাতও রয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে—‘নিশ্চয়ই পাঁচ রাত্রির দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। (১) রজব মাসের প্রথম রাতের দোয়া, (২) শবেবরাতের দোয়া, (৩) শবেকদরের দোয়া, (৪) ঈদুল ফিতরের রাতের দোয়া ও (৫) ঈদুল আজহার রাতের দোয়া।’ (গুনইয়াতুত তালেবিন, মুকাশাফাতুল কুলুব)

শবেবরাত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুসলিমার জন্য এক বিশেষ উপহার। তাই এ রাত সম্পর্কে আমাদের বিশেষ যত্নবান হতে হবে। এ রাতের বিশেষ কিছু আমল হচ্ছে—(১) রাত জেগে ইবাদত করা। যেমন—নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আযকার, তাওবা-ইস্তিগফার ও দোয়া-দরুদ পাঠ করা ইত্যাদি। (২) ১৫ শাবান রাতে জেগে ইবাদত করা এবং পরদিন রোজা রাখা। (৩) সম্ভব হলে আপনজনদের কবর জিয়ারত করা ও দান-সাদকাহ করা।

রসুল (স) নিজের জীবনে এ রাত বারবার পেয়েছেন, আমল করেছেন। এ রাতে কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে—তা তিনি উম্মতকে শিখিয়ে গেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শই আমাদের হুবহু অনুসরণ অনুকরণ করতে হবে। এ রাতের অধিকাংশ ইবাদত নফল। এ রাতের নফল নামাজের ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই, বরং অন্যান্য নফল নামাজের মতো দুই/চার রাকাতের নিয়ত করে সুরা ফাতেহার পর যে কেনো সুরা মিলিয়ে যত ইচ্ছা পড়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই শতর্ক থাকতে হবে যে, রাতভর নফল ইবাদত করে ফজরের নামাজ যেন কাজা না হয়। কেননা হাজার রাকাআত নফল নামাজের সাওয়াব কখনো একটি ফরজ নামাজের সমতুল্য হবে না।

শবেবরাতে যেমন পালনীয় বিষয় রয়েছে, তেমনি এ রাতে কিছু বর্জনীয় বিষয়ও রয়েছে। এ রাতে আতশবাজি, হইহুল্লোড়, অহেতুক কাজে লিপ্ত থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অন্যের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে নিজে কোনো ইবাদত করা যাবে না। আল্লাহ আমাদেরকে এ রাতের গুরুত্ব বুঝে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন!

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English