রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৩৯ অপরাহ্ন

হজরত আয়েশার বিয়ে ও বয়স

রিপোর্টারের নাম
  • প্রকাশিতঃ বুধবার, ১১ নভেম্বর, ২০২০
  • ৪৭ জন নিউজটি পড়েছেন

(গত সংখ্যার পর)
আয়েশার এ বর্ণনাটিও বিবেচনা করা যেতে পারে : ‘আল্লাহর বাণীবাহক আবুবকরের গৃহে আসতেন দিনের শেষে, সকালে অথবা সন্ধ্যার সময় এবং এটাই তার অভ্যাস ছিল। যা হোক, যেদিন তিনি মক্কা ও তাঁর জনগণকে ছেড়ে হিজরত করার জন্য আল্লাহর অনুমতি পান সে দিন তিনি আমাদের কাছে আসেন দুপুরের দিকে। এটি তাঁর জন্য খুবই অস্বাভাবিক ছিল। তাঁকে দেখে আবুবকর বলেন, ‘নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু ঘটেছে যে জন্য আল্লাহর বাণীবাহক এ সময় এসেছেন। রাসূল সা: কামরার মধ্যে এলে আবু বকর নিজের স্থান তাঁর জন্য ছেড়ে দেন এবং রাসূল সা: সেখানে বসেন। আমি ও আমার বোন আসমা ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না।
কিন্তু রাসূল সা: আবু বকরকে বলেন, এখানে যারা আছে তাদের সবাইকে বাইরে যেতে বলুন। আবু বকর বলেন, ‘আল্লাহর বাণীবাহক, এরা আমার দুই কন্যা। ঘটনাটা কী? রাসূল সা: বলেন, আল্লাহ আমাকে হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আবু বকর বলেন, এই যাত্রায় আমি কি আপনার সঙ্গী হবো? রাসূল সা: বলেন Ñ ‘হ্যাঁ, আমরা একসাথে যাবো। আল্লাহর শপথ, ওই দিনের আগে অর্থাৎ আবু বকরকে কাঁদতে না দেখা পর্যন্ত আমি কখনো উপলব্ধি করিনি যে, আনন্দে কেউ কাঁদতে পারে। তখন তিনি বলেন, রাসূল সা:! এখানে আমার দুটো চড়ার উট আছে এবং এ উদ্দেশ্যে আমি তা প্রস্তুত করে রেখেছি…। রাসূল সা:-এর মদিনায় হিজরত করার কিছু আগে আয়েশা রা: যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা-ই তিনি এখানে বলেন।
মদিনায় বসতি স্থাপনের এক বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় পর রাসূল সা:-এর সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় তার বয়স যদি ৯ বছর হয় তাহলে যখন এই আলোচনা ও তার মনোভাব প্রকাশ পায় তখন তার বয়স ছিল ৮ বছর বা তার চেয়ে কম। সাত বা আট বছরের একজন শিশু কি তার পিতার আনন্দের বা দুঃখের কান্নার পার্থক্য নির্ণয় করতে পারেন? এ ধরনের শিশুর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয় তার পিতার মতোÑ সে উত্তেজিত হয় অথবা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তবু আয়েশা রা: নিশ্চিত ছিলেন, তার পিতা আনন্দে কাঁদছেন।
তাছাড়া, মক্কা থেকে চলে যাওয়ার বিষয়টি রাসূল সা: গোপন রাখতে আগ্রহী ছিলেন। লোকেরা যখন কোনো কিছু পরিকল্পনা করে এবং তা গোপন রাখতে চায় তখন তারা তা তাদের শিশু সন্তানদের জানতে দেয় না এই আশঙ্কায় যে, ওই গোপন বিষয় অন্যদের জানানোর বিপদ শিশুরা উপলব্ধি করতে পারেন না। বস্তুত, কুরাইশরা যখন জানতে পারে যে রাসূল সা: ও আবু বকর রা: চলে গেছেন তখন আবু বকরের গৃহে আসে আবু জেহেল। সে আবু বকর রা:-এর মেয়ে আসমাকে তার পিতা কোথায় গেছে তা জিজ্ঞেস করে। আসমা যখন বলেন, তার পিতা কোথায় গেছেন তা তিনি জানেন না, তখন আবু জেহেল তার মুখে চড় মারে। আয়েশা রা:-এর বয়স তখন আট বছর হলে রাসূল সা: ও তার (আয়েশার) পিতা তাকে সেখানে থাকতে দিতেন না এবং তারা চলে যাচ্ছেন এ কথাও জানতে দিতেন না।
অন্য একটি ঘটনায় আয়েশা রা:-এর মনোভাবের দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। ওই ঘটনায় তার মর্যাদা সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ওই ঘটনাটি হলোÑ আয়েশা রা: সম্পর্কে ভণ্ডরা একটি মিথ্যা গুজব ছড়ায়। ওই গুজবে বলা হয়, সাফওয়ান ইবন আল-মুয়াত্তাল নামে রাসূল সা:-এর একজন যুবক সাহাবির সাথে আয়েশা রা:-এর সম্পর্ক ছিল। একমাস ধরে ওই গুজব প্রচারিত হতে থাকে, কিন্তু ওই বিষয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল সা: কিছু করতে পারেননি। ওই মাসের অধিকাংশ সময় আয়েশা রা: অসুস্থ ছিলেন এবং শুশ্রƒষার জন্য তাকে তার পিতা-মাতার বাড়িতে পাঠানো হয়। রাসূল সা: তাকে দেখতে যান এবং বলেন, কোনো ভুল করে থাকলে তিনি যেন অনুতপ্ত হন। আয়েশা রা: তার পিতা-মাতাকে রাসূল সা:-এর সাথে কথা বলতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা বলেন, তারা কোনো বিষয়ে রাসূল সা:কে কিছু বলবেন না। আয়েশা রা: আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং এ জন্য তিনি সবকিছু উপেক্ষা করেন। তিনি নিজের নির্দোষিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত ছিলেন এবং আশা করেন, আল্লাহ তা সবার কাছে স্পষ্ট করে দেবেন। ওই মুহূর্তে রাসূল সা: কুরআনের প্রত্যাদেশ পান এবং ওই প্রত্যাদেশে আয়েশা রা: নির্দোষিতা সমর্থন করা হয়। বিশেষ এই পরিস্থিতিতে আয়েশার মনোভাবকে বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। ওই ঘটনা ঘটে রাসূল সা:-এর মদিনায় হিজরতের পঞ্চম বছরে, অর্থাৎ আয়েশা রা:-এর সাথে তাঁর বিয়ের তিন অথবা চার বছর পরে। বিয়ের সময় তার বয়স যদি সত্যি ৯ বছর হয়ে থাকে তাহলে এসব ঘটনা ঘটার সময় তার বয়স হয়েছিল ১২ অথবা ১৩ বছর। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে দেখা যাক। গুজবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজন স্ত্রীÑ তাকে অভিযুক্ত করা হয় ব্যভিচারের। তার পক্ষে তার পিতা-মাতা একটি কথাও বলেননি। তার স্বামী হলেন আল্লাহর বাণীবাহক। তিনি এসে তাকে বলেন, তিনি যদি এমন কিছু করে থাকেন তাহলে তার অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এসব চাপের মুখে ১৩ বছরের একটি মেয়ে কী মনে করতে পারে? তবু আয়েশা রা: সবকিছু উপেক্ষা করেন, নিজের নির্দোষিতায় দৃঢ় থাকেন। অতঃপর আসমানি প্রত্যাদেশে তার নির্দোষিতা ঘোষিত হওয়ায় সবাই স্বস্তি পান। রাসূল সা: এ কথা তাকে বলেন। আয়েশা রা:-এর মা তাকে বলেন, ‘তার কাছে যাও’। এমন মনোভাব একজন মায়ের যখন নিজের কন্যা সম্পর্কে সব সন্দেহ দূরীভূত হয় এবং তার বিয়ে নিরাপদ থাকে। আয়েশা রা: তা উপেক্ষা করে বলেন, ‘না! আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তার কাছে যাবো না। আমার নির্দোষিতা ঘোষণা করার জন্য আমি শুধু আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাব।’ এখানে আমরা একজন পরিপক্ব মহিলাকে দেখতে পাই যিনি তার স্বামীর সাথে বোঝাপড়া করছেন। আল্লাহর বাণীবাহক হিসেবে রাসূল সা: নয়, তিনি তাকে দেখেছেন তার স্বামী হিসেবে। তার কথায় দৃঢ় প্রতিবাদের ইঙ্গিত ছিল।
তিনি যেন বলছেন, ‘আমি দোষী এ কথা আপনি কিভাবে ভাবতে পারেন? আমার ওপর আপনার কি যথেষ্ট আস্থা নেই? আমার বিশ্বস্ততা নিয়ে অন্য লোকের কাছে আপনি কিভাবে জিজ্ঞেস করতে পারেন?’ এটা নিশ্চিতভাবে ১৩ বছরের একটি মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গি নয়। এটা একজন পরিপক্ব মহিলার, কমপক্ষে ২০ বছরের বেশি বয়সের মহিলার দৃষ্টিভঙ্গি, যিনি তার স্বামীর কথার প্রতিবাদ করেছেন এবং নিজের সততা ও বিশ্বস্ততার ওপর জোর দিয়েছেন।
(এরপর আগামীকাল)

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English