হাদিস পঠন-পাঠনে দেশে যে কয়জন আলেম এ পর্যন্ত গভীর দক্ষতা দেখিয়েছেন তাঁদের অন্যতম মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ (রহ.)। এ জন্য তিনি ‘মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর’ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। আনুমানিক ১৯০৮ সালে তৎকালীন কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর মহকুমার মুমিনপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা এবং পাঁচ ভাইয়ের সবাই ছিলেন আলেম। পরিপূর্ণ ইসলামী পরিবারে বেড়ে ওঠায় শৈশব থেকেই ভদ্রতা ও সুচিন্তায় তিনি ছিলেন অনন্য। ঘরেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষালাভ শুরু। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইউনুছিয়ায়। এখানে দীর্ঘদিন পড়ার পর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। এখানে তাঁর জীবনের চমৎকার একটি ঘটনা ঘটে, তা হলো ভর্তি পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কার ছাত্র? তিনি বলেন, আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর। পরীক্ষকরা উত্তরে বলেন, আগে বললে পরীক্ষা দিতে হতো না। দেওবন্দে তিনি ছয় বছর পড়ালেখা করেন। এ সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা শায়খুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমাদ মাদানি (রহ.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং সমকালীন অপর প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (রহ.)-এর হাতে আত্মশুদ্ধির বাইআত গ্রহণ করেন।
তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয় ঢাকার বড়কাটরা মাদরাসায়। এখানে অন্তত এক যুগ হাদিসের পঠন-পাঠনে নিয়োজিত থাকেন। পরে যোগ দেন জামিয়া কোরআনিয়া লালবাগে। এখানে সুদীর্ঘ ৩৪ বছর হাদিসের অধ্যাপনা করেন। এর মধ্যে ১৩৩৮ হিজরিতে লালবাগের মুহতামিম নিযুক্ত হন। ১৬ বছর পর ১৯৮৬ সালে চলে আসেন জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ীতে। এবং আমৃত্যু এখানেই হাদিসের জ্ঞান বিতরণ করেন। অত্যন্ত সরল প্রকৃতির এ মনীষীর হাতেগড়া অসংখ্য ছাত্র দেশ-বিদেশে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, আল্লমা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী (রহ.) এবং মুফতি মনসূরুল হক (দা.বা.)। তা ছাড়া তাঁর সুযোগ্য পুত্র মাওলানা হিফজুর রহমান রাজধানীর জামিয়া রাহমানিয়া আলী অ্যান্ড নূর রিয়েল এস্টেটের পরিচালক পদে নিয়োজিত আছেন।
কর্মমুখর জীবনের অধিকারী মুহাদ্দিস সাহেব হুজুরের স্মৃতি সংরক্ষণে ‘হায়াতে মুহাদ্দিস ছাহেব (রহ.)’ নামে ২০১৫ সালে একটি স্মারক গ্রন্থ বের হয়েছে। মহান এ মনীষী ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ শুক্রবার বাদ ফজর ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ীতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।