শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন

হেলেনার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১
  • ৭২ জন নিউজটি পড়েছেন
হেলেনা জাহাঙ্গীর

আওয়ামী লীগে পদ হারানো বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে ডিজিটাল মাধ্যমে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব)। গত বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রথমে তাকে আটক করা হয়। এ সময় বাসা থেকে বিদেশি মদ, ওয়াকিটকি সেট, বিদেশি মুদ্রা, জুয়া খেলার সরঞ্জাম, বেশ কয়েকটি ছুরি এবং হরিণ ও ক্যাঙ্গারুর চামড়া জব্দ করে র‌্যাব সদস্যরা। পরে রাতেই মিরপুরে হেলেনার মালিকানাধীন জয়যাত্রা আইপি টিভির কার্যালয় এবং জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন ভবনেও অভিযান চালায় এলিট এই ফোর্স।

শুক্রবার দুপুরে র‌্যাব জানায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গের সম্মানহানি করার অপচেষ্টার অভিযোগে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৫টি মামলার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানায় সংস্থাটি। ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি ‘ভূইফোঁড়’ সংগঠনে হেলেনা জাহাঙ্গীরের সভাপতি হওয়ার খবর চাউর হলে সম্প্রতি তাকে দুই কমিটি থেকেই বাদ দেয় আওয়ামী লীগ। এরপরই বিভিন্ন মহলে এই নারীকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছিল।

হেলেনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ:
গতকাল শুক্রবার বিকালে হেলেনাকে গ্রেফতারের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, হেলেনা জাহাঙ্গীরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে তিনি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মানহানী ও সুনাম নষ্ট করেছেন। এছাড়া তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। তিনি খ্যাতিলাভের আশায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ বিব্রত হয়েছেন।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, হেলেনা অনৈতিক পন্থায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে খ্যাতনামা হিসেবে উপস্থাপন করতে তিনি চতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তিনি নিজে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি করেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ফেসবুক লাইভে এসে অযাচিত ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করতেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তিদের কটাক্ষ ও উত্যক্ত করতেন। পরবর্তীতে ফোন করে সেসব সম্মানীত ব্যক্তিদের হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছেন।

সেফুদার সঙ্গে হেলেনার নিয়মিত যোগাযোগ:
র‌্যাব জানায়, প্রবাসী আলোচিত সেফুদা, যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে দেশবাসীর নজর কাড়তে চেষ্টা করেন; তার সঙ্গেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের নিয়মিত যোগাযোগ ও লেনদেন রয়েছে। সেফুদা তাকে নাতনি হিসেবে সম্মোধন করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জানিয়েছেন।

হেলেনার খ্যাতি বাড়ানোর এজেন্ডা:
র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, নানা অপকৌশলের মাধ্যমে হেলেনা জাহাঙ্গীর নিজেকে মাদার তেরেসা, পল্লীমাতা, প্রবাসী মাতা হিসেবে পরিচিতি পেতে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাকে এসব ভুয়া খেতাব দিয়ে অপপ্রচার চালাতো। বিভিন্ন দেশি বিদেশি সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকে হেলেনা জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের নামে অর্থ সংগ্রহ করতেন। যা মানবিককাজে ব্যবহার করা থেকে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে হেলেনা জাহাঙ্গীরের খেতাবের প্রচার প্রচারণায়। হেলেনা নিজেকে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত রেখে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন। তার প্রায় ১২টি ক্লাবের সদস্যপদ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জানান একটি উচ্চাভিলাসী উদ্দেশ্যে তিনি এ ধরণের কর্মকা-ে লিপ্ত ছিলেন। যা বাস্তবায়ন করতে তিনি নানা অবৈধ পন্থা, অপকৌশল ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। চক্রটি অর্থের বিনিময়ে হেলেনার বিভিন্ন ধরণের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতো।

জয়যাত্রার অফিসে অনুমোদনবিহীন স্যাটেলাইট টিভি সরঞ্জাম:
খন্দকার আল মঈন বলেন, আমরা হেলেনার জয়যাত্রা টেলিভিশনের অফিসে অভিযান চালিয়ে কার্যালয়টি সিলগালা করেছি এবং অবৈধ মালামাল জব্দ করেছি। আইপি টিভির নামে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলেও, ওই অফিসে অনুমোদনবিহীন স্যাটেলাইট টিভি পরিচালনার সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে হেলেনা জানিয়েছেন, তিনি সাম্প্রতিক সময়ে একটি স্যাটেলাইট টিভির জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা করেছিলেন। যে কারণে আগে থেকেই এসব স্যাটেলাইট টিভি পরিচালনার সরঞ্জাম আনিয়ে রেখেছেন। তবে আমাদের সঙ্গে অভিযানে উপস্থিত থাকা বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলেছেন, জয়যাত্রা টেলিভিশনের এসব স্যাটেলাইট সরঞ্জাম ব্যবহারের কোন অনুমোদন নেই।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দুই মামলা:
আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটি থেকে সদ্য পদ হারানো হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ২টি মামলা করা হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর গুলশান থানায় র‌্যাব-১ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী।
তিনি জানান, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা হয়েছে। এছাড়াও বিশেষ ক্ষমতা আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনসহ চারটি ধারায় আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

যেভাবে গ্রেফতার হলেন হেলেনা:
গত বৃহস্পতিবার রাত ৮ টার দিকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের গুলশানের বাড়িতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। দীর্ঘ চারঘন্টা অভিযান চলার পর রাত সোয়া ১২টার দিকে পাঁচ তলা ওই বাড়িতে নিজের ফ্ল্যাট থেকে র‌্যাব সদস্যদের সঙ্গে বেরিয়ে আসেন হেলেনা। এ সময় তার মুখে ছিল মাস্ক। পরনে ছিল বেগুনি রঙের জামা ও হলুদ ওড়না। বাইরে আসার পর হাসিমুখে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে দুবার হাত নাড়েন হেলেনা। এ সময় তিনি কিছু বলতে চাইলেও সেই সুযোগ পাননি। র‌্যাব সদস্যরা তাকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।

যা বললেন হেলেনাকন্যা জেসি:
হেলেনা জাহাঙ্গীর গ্রেফতার হওয়ার পর তার মেয়ে জেসি আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘র‌্যাবের কাছে কোনো ওয়ারেন্ট ছিল না। তারা আমাদের সহযোগিতা করেনি।’

বাসা থেকে মদ উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মদ খাই না। করোনাকালে আমরা অ্যালকোহল খাইনি। মদের কালেকশন আমার ভাইয়ের। এগুলো রাখার লাইসেন্সও তার ছিল। সেই লাইসেন্সও তারা (র‌্যাব) নিয়ে গেছে।’

হরিণের চামড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে হেলেনাকন্যা বলেন, ‘এটি একটি উপহার। মায়ের নেতা-কর্মীরা আমার ভাইয়ের বিয়ের সময় এটি উপহার দিয়েছিলেন।’

বিদেশি মুদ্রার বিষয়ে জেসি আলম বলেন, আমরা প্রায় সময়ই বিদেশে যাতায়াত করি। অনেক দেশে আমরা ভ্রমণ করতে যাই। আমাদের সবার পাসপোর্টও আছে। ফিরে আসার পর সেগুলো বেঁচে গেলে আমরা কি ফেলে দেব নাকি?

ক্যাসিনো সরঞ্জাম সম্পর্কে তিনি বলেন, একটা ক্যাসিনো করতে অনেক সরঞ্জাম লাগে যা আমাদের এখানে ছিল না। আমাদের এখানে তাস ছিল যা আমরা বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম।

কে এই হেলেনা জাহাঙ্গীর?
হেলেনা জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে। বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। হেলেনার বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী সদরঘাট এলাকায়। পড়াশোনা স্থানীয় কৃষ্ণচূড়া স্কুলে। চাকরিসূত্রে তার বাবা রাশিয়ায় চলে গেলে মায়ের সঙ্গে গ্রামে ফিরে যান হেলেনা। হেলেনার স্বামী জাহাঙ্গীর আলমও একজন ব্যবসায়ী। ১৯৯০ সালে তারা বিয়ে করেন। তাদের তিনটি সন্তান রয়েছে।

হেলেনা ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য ও নির্বাচিত পরিচালক। পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএরও সক্রিয় সদস্য তিনি। জয়যাত্রা নামে একটি আইপি টেলিভিশনেরও মালিক হেলেনা। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পুরস্কৃতও হয়েছেন রোটারি ক্লাবের একজন ডোনার হিসেবে। প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১২ হাজার কর্মী কাজ করছেন তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। সাম্প্রতিক ঘটনার পর তাকে ওই কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি।

তবে শোনা যায়, হেলেনা জাহাঙ্গীর আগে জাতীয় পার্টিতে এবং তারও আগে বিএনপির রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ওই দুটি দলের প্রধান খালেদা জিয়া এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে তার ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

হেলেনা জাহাঙ্গীর গুলশান ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গলফ ক্লাব, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলশান জগার্স সোসাইটি ও গুলশান হেলথ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আর নিউজ
© All rights reserved © vira-l.com 2017-2022
themesba-lates1749691102
Bengali English